২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল। সীমান্তে গরুর ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ডান চোখের দৃষ্টি হারায় বাংলাদেশি স্কুলছাত্র রাসেল মিয়া (১৫)। সে এবার বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে চলতি এসএসসি পরীক্ষা অংশ নিয়েছে। তার পরীক্ষা কেন্দ্র মিয়াপাড়া নাজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়।

ওই পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব মো. জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, রাসেলের ব্যাপারটি আগে থেকে জানানো হয়নি। তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেওয়া যেতো।

পরীক্ষা শেষে রাসেল জানায়, অনেক কষ্টে পরীক্ষা দিচ্ছি। বেশি সময় ধরে পড়াশুনা ও লেখালেখি করলে মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা করে। গত বছর জেএসসি পরীক্ষা দিতে তেমন মাথা ব্যথা করেনি। সবার দোয়ায় জিপিএ ৪ পেয়েছি। এবারে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সময় মাথা ব্যথা করছে। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যেন শেষবারের মতো ভারত সরকার আরেকবার আমাকে ভারতে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়।

রাসেলের ভাই রুবেল মিয়া জানান, গত ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতীয় বিএসএফের ছোঁড়া রাবার বুলেটের স্প্লিন্টের আঘাতে গুরুতর আহত হয় রাসেল। প্রথমেই ফুলবাড়ী হাসপাতাল ও পরে রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং সর্বশেষ দীর্ঘ এক মাস ঢাকা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনিস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়।

এ খবর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় একাধিকবার প্রকাশিত হলে আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) সহযোগিতায় ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই-কমিশন আহত রাসেলের উন্নত চিকিৎসার জন্য আবেদন করা হয়। পরে চিকিৎসার আশ্বাস দেন ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই-কমিশন।

আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ২৮ জুলাই তাকে ভারতীয় এয়ারওয়েজে দিল্লীতে নেওয়া হয়। পরে ৩০ জুলাই নিউ দিল্লীর অল ইন্ডিয়া ইনসটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স হাসপাতালে রাসেলের চিকিৎসা শুরু হয়। হাসপাতালের ডাক্তার প্রদীপ কুমার ও সুনীল কুমারের তত্ত্বাবধানে নয় দিন চিকিৎসার করেও তার ডান চোখের আলো ফেরানো যায়নি।

রুবেল আরও জানান, প্রথম দফায় ভারতে নয় দিন ও দ্বিতীয় দফায় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি দিল্লীর একই হাসপাতালে দুই দিন উন্নত চিকিৎসা নিলেও ডান চোখের দৃষ্টি ফেরেনি। রাসেলের ডান চোখে দুইটি, বাম চোখে একটিসহ মাথা, কান ও সমস্ত মুখে এখনো ৪৮টি পিলেট স্প্রিন্টার রয়েছে। যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। শুধু ভারতে নয় বাংলাদেশেও এখনো তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। একটু ব্যথা হলেই ডাক্তার দেখাতে হয়। তার চিকিৎসার জন্য চারটি গরু ও পাঁচটি ছাগল এবং জমি বন্ধকসহ আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা এ যাবত খরচ হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত গত ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমন্ডল সীমান্তে আন্তর্জাতিক মেইন সীমানা পিলার ৯৩০/৮ এর পাশে বাংলাদেশের ২০ গজ অভ্যন্তরে রাসেল বন্ধুদের সঙ্গে গরুর ঘাস কাটতে যায় রাসেল। এ সময় ৩৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে অন্যরা অক্ষত থাকলেও স্কুলছাত্র রাসেলের মুখমণ্ডলে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রাইম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষু, বিজ্ঞান ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য