আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধাঃ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সবাইকে কাঁদিয়ে স্কুল পড়ুয়া ছোট্ট শিশু সন্তানসহ শিক্ষক বাবার একইসাথে অকাল পরপারে পাড়ি দেবার বিষয়টি যেন কেউই ভুলতে পারছেনা। শোকের মাতম যেন থামছিল না।

৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত ৮টার দিকে পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা সড়কের মুচির তেঁকানিতে কাকতালীয় কোন এক অজ্ঞাত যানবাহনের সাথে মোটরসাইকেল সড়ক দূর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রেক্ষাপট যেন কেউই মেনে নিতে পারছেনা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মি শিক্ষকমন্ডলী, শিক্ষার্থী-অভিভাবক, পাড়াপ্রতিবেশি, শুভাকাঙ্খি ও যত পরিচিতজন সবাই তাদের ছলছল অশ্রুসিক্ত নয়নে চিরবিদায় জানালেন প্রিয় একজন মানুষকে। চোঁখের জলে চিরবিদায় জানালেন প্রিয় একজন শিক্ষক ও আমাদের পরম আদর-স্নেহের স্কুল পড়ুয়া নিষ্পাপ তার সন্তানকে।

শনিবার বাদ যোহর গ্রামের বাড়ী পলাশবাড়ী উপজেলার তালুক ঘোড়াবান্দায় নামাজে জানাজা শেষে পিতা ও পুত্রকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। নামাজে জানাজাসহ দাফন সম্পন্ন করতে উপস্থিত সহকর্মি শিক্ষক-অভিভাবকসহ স্বজনরা কেউই তাদের চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বাবা মোমিনুল ইসলামের বয়স ৪৫ এবং দুই ছেলের মধ্যে নিহত বড় ছেলে মাহির বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। এমন অকাল মৃত্যু কারোরই কাম্য নয়। তাও আবার ছোট্ট সন্তানসহ একটি সড়ক দূর্ঘটনায়। একটি সড়ক দূর্ঘটনা-একটি মৃত্যু একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। তবুও নিয়তি। তাকে মেনে নিতেই হবে। বড় ভাই মাহি রেখে গেলেন তার সহোদর ৪ বছরের একমাত্র ছোট্ট ভাই আর মমতাময়ী গর্ভধারিণী মা’কে আর বাবা রেখে গেলেন স্নেহের শিশুপুত্রসহ প্রিয় সহধর্মিণী স্ত্রীকে।

একজন সদালাপী, নম্র-ভদ্র আর সহজ-সরল স্বভাবের মোমিনুল ইসলাম ছিলেন উপজেলার সাঁতারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি সবার মনেই সমাদৃত ছিলেন। এদিন শুক্রবার প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তিনি তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে যান। সেখানে তার সহোদর বড়ভাই কিছুদিন আগে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের কুলখানি অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই মোমিনুল ইসলাম এদিন সকালে স্ব-পরিবারে গ্রামের বাড়ীতে যান।

শুক্রবার দিন শেষে রাতে গ্রামের বাড়ী থেকে ফিরে আসছিলেন পলাশবাড়ী শহরের বাসা অভিমুখে। একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া কেউই জানতেন না তাদের এখানে মৃত্যু ঘটবে। বাড়ী থেকে রওনার প্রাক্লালে মোমিনুল তার অপর শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে মাঝপথে একটি অটো টেম্পুতে তুলে দেন। নিজে বড় সন্তান মাহিকে সাথে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে রওনা দেন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দূর্ঘটনায় নিহত হলেন। একই সড়ক যোগে অটোতে চড়ে আসা শিশু সন্তান কোলে ওই দুর্ঘটনাস্থলেই এসে দেখেন একটু আগে আসা তার স্বামী-সন্তানের ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত নিথর দেহ রাস্তার মাঝে পড়ে। এমন বিভৎস দৃশ্য চোঁখে দেখে তিনি আকস্মিক মূর্চ্ছা যান। সময়ের এমন দূর্বিপাকের আবর্তে পরবর্তিতে তিনি আর কিছু বলতে পারছিলেন। এসময় নির্বাক সহধর্মিণীর জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে। যতদূর জানা যায় একটি মাইক্রোবাস কিংবা কাকরা ট্রাক্টর জাতীয় যানবাহন চলন্ত মোটরসাইকেলকে পিছন থেকে চাপা দেয়।

উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের তালুক ঘোড়াবান্দা গ্রামের মৃত খেজের উদ্দিনের ছেলে মোমিনুল। শিক্ষকতা পেশা এবং সন্তানের লেখাপড়াসহ নানা সুবিধার জন্যই তিনি পলাশবাড়ী শহরের ইউনিক রোডের একটি ভাড়া বাসায় স্বপরিবারে বসবাস করছিলেন। এরইমধ্যে তার পরিবারের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় ঈদগাহ মাঠ এলাকায় ১০ শতাংশ জমিও ক্রয় করেন বলে জানা যায়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সব পরিকল্পনা যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো। মোমিনুল উপজেলার সাঁতারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আর পুত্র মাহি স্থানীয় ইউনিক কিন্ডার গার্টেনের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ালেখা করছিল। প্রিয় শিক্ষার্থী মাহি ও তার বাবা মোমিনুলের আকস্মিক অকাল মৃত্যুতে তার বিদেহী আত্মার শোক জ্ঞাপনে শনিবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ক্লাশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য