ছোটখাট শারীরিক সমস্যাগুলো অবহেলা করা উচিত নয়।

বদহজম, কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, জ্বর, মাথাব্যথা, অবসাদ ইত্যাদি শারীরিক সমস্যা সচরাচর দেখা যায়। তবে দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার ভীড়ে এসব ছোটখাট শারীরিক সমস্যার দিকে নজর দেওয়ার সময় কই? তাই উপসর্গগুলো আমরা অবহেলা করি, চিকিৎসকের কাছে যেতে চাই না। তবে এই ছোট উপসর্গগুলো দিয়েই শরীর আমাদের বড় ঝুঁকির কথা জানান দেয়।

উপসর্গগুলোর প্রতি অবহেলা অনেক সময় চিকিৎসকরাও করে ফেলেন। ফলে রোগ নির্ণয়ে ভুল হয়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ভারতীয় চিকিৎসক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কে কে আগারওয়াল।

আমাদের করণীয় হওয়া উচিত কোনো শারীরিক সমস্যাকেই অবহেলা না করা। বিশেষ করে, যে শারীরিক সমস্যাগুলো আগে কখনও দেখা দেয়নি সেসব শারীরিক সমস্যাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সাধারণ এই সমস্যাগুলোই হয়ত বড় কোনো রোগের পূর্বাভাস, তাই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শের আওতায় থাকা উচিত।

অনেকেই সাধারণ শরীর ব্যথা কিংবা শরীরে শক্তি না পাওয়ার অভিযোগ করেন। তবে তা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ আর নেওয়া হয়না। হয়ত তা সাধারণ ক্লান্তি, আবার হতে পারে ভিটামিন ডি কিংবা লৌহের অভাবও। গৃহস্থালী কাজের মাত্রা বাড়ার কারণে শরীরে এই পুষ্টি উপাদানগুলোর অভাব তৈরি হতে পারে।

গড় হিসাবে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভিটামিন ডি’য়ের অভাবে ভুগছেন। আর নারীদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় এর উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয় ‘অস্টিওম্যালাসিয়া’ বা শরীর ব্যথা। আবার শরীরে শক্তি না পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ রক্তশূন্যতা। আর এসময় নারীদের উচিত লৌহ ও ‘ফোলিক অ্যাসিড’য়ের ‘সাপ্লিমেন্ট’ গ্রহণ করা। এছাড়াও গুড় ও ছোলা খাওয়ার অভ্যাস এই পুষ্টি উপাদানের অভাব পূরণ করতে পারে।

কে কে আগারওয়াল বলেন, “লৌহ আর আমিষ একসঙ্গে গ্রহণ করলে লৌহ শরীরে ভালোভাবে শোষিত হয়।”

রোগী কখন তার শারীরিক সমস্যা নিয়ে অভিনয় করছে না তা বোঝানোর জন্য নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কে কে আগারওয়াল বলেন, “কিছুসময় আগে মধ্যবয়সি একজন নারীর মস্তিষ্কের টিউমার সনাক্ত করতে গিয়ে ভুল করি। সেসময় মাত্র কিছুদিন আগে এই নারী তার ছেলেকে হারান, তিনি প্রচণ্ড মনকষ্টে ছিলেন এবং অনিদ্রায় ভুগছিলেন। তাকে চিকিৎসা হিসেবে ছয় মাসের ‘সেডেটিভ’ দেওয়া হয়। তবে সমস্যার কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়নি। এখানে মনে রাখা উচিত ছিল, মনকষ্ট দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়না আর এর বেশি সময় স্থায়ী হওয়া যে কোনো মানসিক কষ্ট পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।”

আরেক রোগীর গল্প বলেন আগারওয়াল। এই রোগীর অভিযোগ ছিল তার স্ত্রীর কারও সঙ্গে পরকীয়া চলছে, আর এই অভিযোগ তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিলেন।

পরে তার মস্তিষ্কেও ‘টিউমার’ ধরা পড়ে, যা উপসর্গ ছিল প্রচণ্ড মানসিক অশান্তি ও সন্দেহপ্রবণতা।

আগারওয়ালের নিজের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তার ফুসফুসে ধরা পড়ে ‘ক্লট’। তবে ১০ দিন ধরে তার উপসর্গগুলোকে নিছক মানসিক অস্বস্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কারণ তার সকল স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফল ছিল স্বাভাবিক।

চিকিৎসকদের এই ঘটনাগুলো থেকে এই শিক্ষা নেওয়া উচিত যে প্রতিটি চিকিৎসকের উচিত রোগী কথা, অভিযোগ মনযোগ দিয়ে শোনা। কারণ রোগী কি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার বর্ণনা রোগীর চাইতে ভালোভাবে আর কেউ দিতে পারবেনা।

দ্য ওয়ার্ল্ড মেডিকল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, কোনো ডাক্তারের তাদের নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের রোগ নির্ণয়ের দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কাছের মানুষদের উপসর্গগুলোকে অবহেলার চোখে দেখেন কিংবা তাদের যে মারাত্মক কোনো রোগ হতে পারে সেটা তারা ভাবতে পারেন না।

আবার ইন্টারনেটে বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে রোগীর গবেষণারও আছে ভয়ানক পরিণতি। ইন্টারনেটে একটি সাধারণ সমস্যা নিয়ে জ্ঞান নিতে গিয়ে তারা সেই উপসর্গের সঙ্গে নানান ভয়ানক রোগের উপসর্গের মিল পায়। সেই রোগগুলো অন্যান্য উপসর্গগুলো জানতে গিয়ে রোগীরা অনেকসময় ভেবে নেয় যে তারও হয়ত এই উপসর্গগুলো আছে। আর এসব মনগড়া উপসর্গ যখন তারা চিকিৎসকের কাছে বলেন এবং তারা প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারেন তখন তাদের গল্পগুলোকে অবান্তর ধরে নেন।

তবে ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে অনেকসময় চিকিৎসকরা প্রকৃত উপসর্গকেও অবহেলা করে বসেন, মনগড়া ভেবে বসেন।

যেসব উপসর্গকে অবহেলা করা যাবে না

– বয়স ৪০ পেরোলে বুক জ্বালাপোড়া বা ‘অ্যাসিডিটি’কে কখনই অবহেলা করা যাবে না। কারণ তা হলে হৃদরোগ কিংবা হার্ট অ্যাটাকের পূর্বাভাস।

– বয়স ৪০ পার হওয়ার পর যদি হাঁপানি দেখা তবে তা শুধু হাঁপানি নাও হতে পারে। নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা।

– শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে অস্বাভাবিক শব্দ মানেই হাঁপানি নয়। আবার সব হাঁপানি রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে অস্বাভাবিক শব্দ নাও হতে পারে।

– মাথাব্যথা মানুষের জীবনে অসংখ্যবার হয়। তবে কখনও যদি প্রচণ্ডমাত্রায় মাথাব্যথা হয়, যার ধরন নতুন এবং যার কোনো ব্যাখ্যা নেই, তবে উচিত হবে তৎক্ষণাত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

– কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে ওঠার পর যদি অবসাদগ্রস্ত মনে হয় তবে তা পরীক্ষা করানো উচিত।

ছবি: রয়টার্স।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য