কম বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। স্বাভাবিকভাবেই জীবন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ডায়াবেটিস হলে রোগী মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েন, বিশেষত তরুণীরা। অনেকেই মনে করেন স্বাভাবিক জীবনের মতো বিয়ে করা আর মা হওয়ার মতো বিষয়গুলো তাদের জীবনে আর ঘটবে না। অথচ বিষয়টি ঠিক নয়।

দীর্ঘ ২১ বছর ধরে তরুণীদের ‘টাইপ ওয়ান’ ও ’টাইপ টু’ ডায়াবেটিস নিয়ে কাজ করছে ভারতের ‘ডোর টু কেয়ার’ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ‘এন্ডোক্রিনোলজিস্ট’ ডা. বিনা বানসাল।

তার অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই বিষয়ে জানানো হল বিস্তারিত।

ডা. বিনা বানসাল বলেন, “দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বেশিরভাগ রোগীর মাঝেই আমি ভয় ও শঙ্কা দেখেছি। একজন স্ত্রী এবং মা হিসেবে তারা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন কি-না সেই বিষয়েই তাদের শঙ্কা বেশি। অনেকেই এমন পরিস্থিতি পরিবার কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে তেমন সহানুভুতি পান না। সামাজিক হীনমন্যতা, রোগ নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা, কুসংস্কার ইত্যাদি মিলিয়ে তারা মানসিক এবং আবেগতাড়িত জটিলতায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত।”

“সামাজিক হীনমন্যতা, মানুষের কটু কথা ইত্যাদি ডায়াবেটিস রোগীদের নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিতে থাকে। যে কারণে সঠিক চিকিৎসাও তাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি কার্যকর হয় না। আর এই ব্যাপারগুলো পুরুষের তুলনায় নারীদের অনেক বেশি ভোগায়। ধরে নেওয়া হয় তারা সাংসারিক জীবনের অযোগ্য। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধুমহল সবখান থেকেই তারা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে থাকেন। একারণেই এবিষয়ে সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আমি দূর করতে চাই এবং ভুক্তভোগী নারীদের দিতে চাই আশার আলো।”

নিজে ভেবে নেবেন না, চিকিৎসকের কাছ জানতে হবে: শহর কিংবা মফস্বল, সবখানেই ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভুল ধারণাগুলোর প্রধান কারণ হল রোগটি সম্পর্কে জনসাধারণের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব। রোগীর চারপাশের মানুষগুলো বিভিন্ন ভুল তথ্য দিয়ে রোগীর মাঝে রোগটি সম্পর্কে ভয় সৃষ্টি করতে থাকে। মেয়ের ডায়াবেটিস থাকলে তার বিয়ে হবে না এমন ধারণা পোষণ করা পরিবারের সংখ্যা নেহাত কম নয়। পাশাপাশি প্রচলিত ধারণা আছে, ডায়াবেটিস থাকলে একজন নারী মা হতে পারবেন না। আর পারলেও সন্তানের ডায়াবেটিস হওয়া মারাত্বক ঝুঁকি থাকবে।

এই অবস্থায় রোগী ও তার পরিবার সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্বটা ডাক্তারের উপর বর্তায়। সেখানে থাকতে হবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সাধারণ নিয়ম, গর্ভধারণের আগে-পরে এমন গর্ভবতী অবস্থায় করণীয়-বর্জনীয় ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা। রোগীকে বোঝাতে হবে যে, গর্ভবতী অবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে সমস্যা বাড়ে সেকথা ঠিক, তবে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উন্নয়নের বরাতে এখন সেগুলো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সমস্যা গোপন করা যাবে না: ডা. বিনা বলেন, “আমি অনেক রোগী দেখেছি যারা বিয়ের আগে হবু বর ও তার পরিবারকে নিজের ডায়াবেটিসের কথা জানাবে কি-না তা নিয়ে প্রচণ্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। অনেকে জানিয়েছেন, বিয়ের পর স্বামী ও তার পরিবার যখন ডায়াবেটিসের কথা জানতে পেরেছে, তখন তাদেরকে ‘ইনসুলিন’ নেওয়া বন্ধ করে ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।”

“ডায়াবেটিসের কথা গোপন রাখার কারণে রোগীকে অনেক ভুল ওষুধ খেতে দেখা গেছে, যার ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। অনেক রোগীর মাঝে দেখা দিয়েছে ‘কিটো-অ্যাসিডোসিস’ নামক সমস্যা। যেখানে রোগীর রক্তে অ্যাসিডের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং তাদের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।”

“নতুন রোগীরা তাদের রোগ লুকানোর জন্য গোপনে ‘ইনসুলিন’ নেন এবং ‘ব্লাড সুগার’ মাপেন। সময় মতো ওষুধ খেতেও তাদের ঝামেলা পোহাতে হয়, যে কারণে অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।”

আমার পরামর্শ হল, “পৃথিবীর কোনো কিছুই আপনার নিজের স্বাস্থ্যের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই নিজের যত্ন নেওয়াতে কখনই অবহেলা করবেন না। যার ‘ইনসুলিন’ নিচ্ছেন তাদের চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ নিতে হবে কোন ‘ইনসুলিন’ নিতে হবে, কত মাত্রায় নিতে হবে, কোন সময় নিতে হবে। এখানে নিজে ডাক্তার হওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ।”

নিজেকে দোষারোপ করা যাবে না: ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে রোগীর নিজের দায় থাকে না বললেই চলে। অনেকেই বলবেন, ওজন নিয়ন্ত্রণ করলে, মিষ্টি কম খেলে ডায়াবেটিস হত না। ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে, যা বেশিরভাগই রোগীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হয়ত কিছুটা কমত, তবে পুরোপুরি ঝুঁকি মুক্ত করতে পারত না। তাই আপনার দোষে ডায়াবেটিস হয়েছে এই ধারণা মনে পুষে রেখে অপরাধবোধ বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না।

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনার উপায় নিয়ে ডা. বিনা বলেন, “প্রতিনিয়ত ডায়াবেটিস নিয়ে আতঙ্কে থাকার কারণে রোগী প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভুগতে থাকেন। সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে রোগীদের এই মানসিক অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে হলে। ভুল ধারণাগুলো দূর করতে হবে, ডায়াবেটিস থাক আর থাক, তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে সবার। সচেতন রোগীদেরও এগিয়ে আসতে হবে নতুন রোগীদের সহযোগিতায়। আর চিকিৎসক, পরিবার, কাছের মানুষদের কাজ হবে রোগীকে সাহস যোগানো।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য