সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মধ্যে আইনটির বিরোধিতা করে যত আবেদন এসেছে, সবগুলো গ্রহণ করে সেগুলোর পরবর্তী শুনানি আগামী মাসে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

আইনটি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিজেদের বক্তব্য প্রস্তুত করারও সময় দিয়েছে তারা। তবে সে সময় পর্যন্ত আইনটির প্রয়োগ ও কার্যকারিতায় কোনো স্থগিতাদেশ দেওয়ার আবেদন আদালত খারিজ করেছে এবং আইনটির বৈধতা খতিয়ে দেখতে সরকারকে নোটিশ দিয়েছে।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে অসন্তোষের মধ্যে বুধবার সুপ্রিম কোর্ট এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

নতুন আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে ৬০টি মামলা দায়ের হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে।কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ, আসামের ক্ষমতাসীন বিজেপি’র সহযোগী দল আসাম গণ পরিষদ এবং ডিএমকেসহ অনেকেই আদালতের দারস্থ হয়েছে।

এগুলোরই সংক্ষিপ্ত শুনানিতে আদালত বুধবার কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিশ দিয়েছে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য জানাতে। আবেদনগুলোর পরবর্তী শুনানির দিন ২২ জানুয়ারি শীর্ষ আদালতে কেন্দ্রকে তাদের বক্তব্য জানাতে হবে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।

চলতি মাসে ভারতে পাস হওয়া সিএএ-তে ২০১৫ সালের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের দাবি, সংশোধিত এ আইন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে নির্যাতিত হওয়াদের সুরক্ষা দেয়ায় ভূমিকা রাখবে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, সিএএ-র মাধ্যমে বিজেপি আদতে তাদের ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী’ এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করতে চায়, যাতে ভারতের সংখ্যালঘু ২০ কোটি মুসলমানকে আরও কোণঠাসা করা যাবে।

আইনটি কার্যকর হলে সরকার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ফেরত পাঠাতে পারে, এমন ভয়ও আছে।

নাগরিকত্ব প্রমাণে নিজের বা পূর্বপুরুষদের নথি দেখাতে হবে; যা অনেক মুসলমানকে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে তুলতে পারে বলেও আতঙ্ক অনেকের ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী অবশ্য তাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন ‘হিন্দু, মুসলমান, শিখ, জৈন, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ যারাই ভারতের নাগরিক’ তাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

মঙ্গলবার এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তৃতায় বিজেপি এ শীর্ষ নেতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও গুজব ছড়ানো’, ‘সহিংসতায় মদদ’ এবং ‘সর্বশক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির জাল সৃষ্টির’ও অভিযোগ আনেন।

প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর কণ্ঠেও।

“আমার সরকার এবং আমি এ বিষয়ে ইস্পাতদৃঢ় অবস্থান নিয়েছি; আমরা এই আইনবিরোধী বিক্ষোভে পিছু হটবো না, একবিন্দুও নড়বো না,” বলেছেন তিনি।

গত সপ্তাহে সিএএ পাস হওয়ার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে তুমুল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ শুরু হয়।

বিরোধী দলগুলো বলছে, সংশোধিত এ আইন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। কাউকে তার ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া ঠিক হবে না বলেও অবস্থান তাদের।

অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বাসিন্দাদের মনে অন্য ভয়। তাদের ধারণা, আইনটি কার্যকর হলেপ্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারতে ঢোকার পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।

আইনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে পুলিশের বর্বরতা নিয়েও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ চলছে।

রোববার রাজধানী দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী বিক্ষোভ সহিংসতায় পরিণত হওয়ার পর কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়; তারপর থেকেই পুলিশি হামলার প্রতিবাদে দিল্লিতে ব্যাপক গণবিক্ষোভ চলছে।

প্রধান বিচারপতি এসএ বোবদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে ওই আইন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাখ্যা জানতে চায় আদালত। এছাড়া আইনটি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়া হলেও আদালত তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালতের আদেশে বলা হয়, আইনটি কেন স্থগিত করতে হবে তা আগে দেখতে হবে। আগামী ২২ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য