আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাটঃ নাম তার জহিরন বেওয়া। প্রায় ৪৬ বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন তিনি। গ্রাম বাংলার গরিবের ডাক্তার তিনি। ‘বাংলার নানী’ নামে খ্যাত জহিরন বেওয়া। ছোট থেকে বুড়ো সবাই এক নামে চেনে তাকে। কারণ ৯০ বছর বয়সী এই বিধবা নারী নিজেই সাইকেল চালিয়ে এলাকার অসুস্থ মানুষদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

জহিরন বেওয়ার বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের (৫নং ওয়ার্ড) ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা তালুক বারঘড়িয়া এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, মহীয়সী এই নারী কয়েক মাস বা কয়েক বছর নয়, ৪৬ বছর ধরে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা, ছুটে চলেছেন উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

রাজ্জাক নামে এক স্থানীয় বলেন, গত কয়েক দশক থেকে আমি তাকে দেখছি প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে এই এলাকায় মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

জানা যায়, ১৯৭৩ সালে স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনার ওপর ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ছিলেন জহিরন বেওয়া। এরপর থেকে সেবা দিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, জহিরন মানুষকে বিনা মূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এর জন্য তিনি কোনো টাকা নেন না। ওষুধ দিলে তাও আবার বাজারে যে দাম সেই দামেই দেন। আবার গ্রামের গরীব লোকদের কাছ থেকে ওষুধের টাকাও নেন না।

এ প্রসঙ্গে জহিরন বলেন, আমি লোকজনকে সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেই। জটিল রোগের জন্যে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেই। কখনো কখনো তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করি।

এদিকে জহিরনের চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট স্থানীরা। তারা জানান, জহিরন কোনো ডাক্তার না। কিন্তু তার (জহিরন) অভিজ্ঞতা অনেক। সাধারণ রোগ থেকে মুক্তি পেতে তারা জহিরনের ওপর বেশি ভরসা করেন।

কয়েক বছর আগে স্বামীকে হারান জহিরন। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তার তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। এদের মধ্যে বড় ছেলে দানেশ আলীকে হারিয়েছেন তিনি ৯ বছর আগে।

তার ছোট ছেলে ৫৯ বছর বয়সী তোরাব আলী জানান, তাদের তেমন কোনো আর্থিক কষ্ট নেই। তার মায়ের কাজের প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও তার মা সকাল হলেই ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে।

তোরাব আলী বলেন, মাকে অনেকবার বলেছি কাজ না করতে। তবুও তিনি শোনেন না। মা বলেন-তিনি যা করেন তা নিজের জন্য করেন না, সমাজের জন্যে করেন।

জহিরন প্রতিদিন অন্তত আটটি গ্রামের ৬০টি বাড়িতে যান। আর প্রতিমাসে ৩০টি গ্রামে। পঞ্জিকা অনুসারে বয়স বাড়লেও এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ জহিরন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের করে যেতে চান।

জহিরন বলেন, একটি সাধারণ সাইকেলের মতই আমার স্বপ্নগুলো। সেটি হচ্ছে শেষ নিশ্বাস নেওয়ার আগ পর্যন্ত আদিতমারীর গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাওয়া।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য