দিনাজপুর সংবাদাতাঃ ১৯৭১ সালের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর পার্বতীপুরের মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দুদিন মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে ভীত হয়ে ১৫ ডিসেম্বর রাতের প্রথম প্রহরে পাকবাহিনীরা পালিয়ে গেলে হানাদার মুক্ত হয় পার্বতীপুর।

মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডার মোঃ আলাউদ্দিন, কমান্ডার মরহুম আফজাল হোসেন, কমান্ডার মরহুম আবু বকর সিদ্দিক, আমজাদ হোসেন, আহমেদ আলী মংলু, কমান্ডার মরহুম আবু মুসা, কমান্ডার মরহুম তমেজ উদ্দিন, মজিবর রহমান ও কমান্ডার মরহুম ইব্রাহিম প্রামানিক সবাই নিজ নিজ দলের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পার্বতীপুর শহর ঘিরে ফেলেন। শহরের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে প্রচন্ড ফায়ার শুরু করেন তারা।

এর আগে ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমান বাহিনীর তিনটি বোমারু বিমান পার্বতীপুর ও সৈয়দপুরে বোমা নিক্ষেপ করে। এর একটি বিমান পার্বতীপুর রেল জংশন স্টেশনের উত্তর দিকে অবস্থিত ডিজেল সেডের তেলের ট্যাংকারে বোমা ফেলে। এতে ধ্বংস হয় ট্যাংকারটি। কালো ধোঁয়া ও আগুনের শিখা সীমান্তের ওপারে ভারতের ভেতর থেকেও দেখা যায়। দেশে রংপুর, সৈয়দপুর,নীলফামারী,দিনাজপুর, সেতাবগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকেও আগুনের শিখা দেখা যায়। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সৈন্য, মিলিশিয়া বাহিনী, পুলিশ, বিহারি রাজাকার, বাঙালি রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও পার্বতীপুরে বসবাসকারী অর্ধ লক্ষাধিক অবাঙালি বিহারিদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে।

সেদিন সবার চোখে মুখে ভয়ভীতির ছাপ পরিলক্ষিত হয়। আর সারাদিন আলোচনার বিষয় ছিল ‘ডিজেল ভি নেহি তো ইঞ্জিন ভি ক্যায়সে চলারাহা, আওর ইঞ্জিন নেহিতো ক্যায়ছে ট্রেন (ট্রেন) চলাতা’। এর অর্থ হলো, ডিজেল না হলে তো ইঞ্জিন কেমনে চলবে। আর ইঞ্জিন ছাড়াতো ট্রেন চলবেনা। এদিন এখানকার বিহারি রাজাকার কমান্ডার বাচ্চাখান, কামরুজ্জামান এমএনএ, তার বড় ভাই শোয়েব, মতিয়ার, ঠিকাদার ইকবাল, ওদুদ, আর বদরু চেয়ারম্যানসহ সব বিহারি নেতারা পরিবার পরিজনসহ পাশের সৈয়দপুরে পালিয়ে যায়।

পরে তারা পাকিস্তানে চলে যায় সেখান থেকে। অন্যদিকে, সমস্ত বিহারি ১৪ ডিসেম্বর রাতে ২টি বিশেষ ট্রেনযোগে সৈয়দপুরে চলে গেলে পার্বতীপুর শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চল হানাদার দখলদার পাস্তিানি সৈন্যমুক্ত হয়। ১৫ ডিসেম্বর পার্বতীপুর মুক্ত হয়। সেদিন সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করে বিজয়োল্লাস করে। মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার বিজয় উদযাপন চলে ১৬ ডিসেম্বর গভীর রাত পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। সারাদেশে ওই দিন থেকে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু পার্বতীপুরের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।

এখানকার শহর ব্যবসা বাণিজ্য, রেলের চাকুরি সবকিছু ছিল অবাঙালি বিহারিদের দখলে। ১৯৬৯ সাল থেকে এখানকার বাঙালিরা পার্বতীপুরকে বিহারিমুক্ত করার সংকল্প নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামকে বেগবান করে আসে। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে বিভিন্ন কয়লার ইঞ্জিনে জ্বলন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারে বিহারি ও খান সেনারা। এসময় যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হাবড়া ইউনিয়নের হাকিম চেয়ারম্যান, পার্বতীপুর শহরের নতুনবাজারের ডাঃ সামসাদ ও পাওয়ার হাউজ রেল কলোনির ইমান হোসেনের পরিবার। বর্তমানে পার্বতীপুর পৌরসভা ও রাজশাহী কৃষিউন্নয়ন ব্যাংক এই ভবনের নাম ছিল শোয়েব বিল্ডিং। শোয়েব ছিলেন বাচ্চা খান এমএনএ’র বড় ভাই।

এই বিল্ডিংয়ের পূর্ব পাশে গলির মধ্যের একটি বাড়ি ছিল টর্চার সেল। অসংখ্য বাঙালি যুবককে এখানে চোখ বেঁধে এনে টর্চার করা হতো। একসময় এদের হাত পা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে কয়লার ইঞ্জিনের জ্বলন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারা হতো। রেলজংশনের বহু বাংলোকে টর্চার সেল ও বিহারি, পাকি সৈন্যদের ফূর্তি করার স্থান করা হয়েছিল। এসব জায়গায় যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের ছিন্নভিন্ন দেহ বধ্যভূমিতে ফেলা হতো। দীর্ঘদিন পরে ্ওই জায়গাটিতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ করা হয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাস পার্বতীপুরে যুদ্ধ হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ও বিহারি রাজাকারের মধ্যে। বাঙালি রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে এবং সবশেষে সর্বাত্বক যুদ্ধ করেছে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বিমানবাহিনী।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ যুদ্ধকালীন সে দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ১৫ ডিসেম্বর পার্বতীপুর হানাদারমুক্ত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনীরা সকল রাজাকারদের খুজতে থাকি। ভোটগাছ এলাকায় মোসলেম উদ্দীন নামের এক রাজাকারকে পাই আমরা। ধরে তার হাত, পা, কানসহ বিভিন্ন অঙ্গ কেটে পুরো গ্রাম জুতার মালা পড়িয়ে ঘুরাই তাকে। এ সময় সে বলেছিলো আমাকে এভাবে কষ্ট না দিয়ে শুট করে একবারে মেরে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত তার শরীরের অঙ্গগুলো এক এক করে কাটার পর শুট করে পূর্ব থেকে খুরে রাখা কবরে লাথি মেরে ফেলে দেয় আমাদের সাথী মুক্তিযোদ্ধারা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য