আমার লিখার ক্যাপশনটি পড়ে অনেকের চোখ কপালে উঠবে, কেউ কপাল কুচকাবে, কেউ বলবে ফালতু, আবার কেউ বলবে দালালি। হয়তো আমি অসময়ে লিখছি, কিন্তু কিছুদিন থেকেই যে বিষয়টা মনের মধ্যে খচখচ করছে তা হচ্ছে, আমাদের দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানা পেশার মানুষের মধ্যে নানান রকম মতভেদ তৈরি হয়েছে।

গত কদিন আগে এক চা’য়ের দোকানে চা বিস্কিট খেতে বসেন এক মুক্তিযোদ্ধা। এক সময় তিনি মানুষের কাছে হাত পাততেন, সংসার চালানোর জন্য তাকে প্রায় প্রতিদিন শহরের কারো না কারো দরজায় দাঁড়াতে হতো।, সরকারের ভাতা পেয়ে বর্তমানে তিনি ভাল ভাবে চলছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, বড় ছেলের একটা ছোটখাট সরকারি চাকরি হয়েছে, ছোট ছেলে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখাপড়া করছে। তাকে দেখে স্থানীয় দুই দোকান কর্মচারির আলাপচারিতায় যেটুকু স্পষ্ট হলাম, তা হচ্ছে এই লোকটাকে এত সুবিধা কেন দেওয়া হচ্ছে। বয়স ওদের কম, তাই মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান বা বলিদান সম্পর্কে ওদের কোন ধারনা নেই। কারো মুখে অপ্রিতিকর অবান্তর কিছু শুনে, না বুঝেই তারা এমনটি বলছে। কিন্তু সেই জায়গায় বহু বয়স্ক লোকজন বসেছিল, যারা যুদ্ধ দেখেছে। লক্ষ করলাম কেউ ছেলেগুলোর ধারনা পরিবর্তনের চেষ্টা করলো না। তাছাড়া শহরের যে স্থানে ব্যপারটা ঘটেছে সেটা একটি রাজনৈতিক স্থান। আর সেই বয়স্ক লোকগুলো কম বেশি সকলে রাজনিতির সাথে জড়িত, বিষয়টা দুঃখজনক।

আসলে একসময় রাজনৈতিক দল গুলো নিজেদের প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করেছে, প্রয়োজন ফুরালে ভুলে গেছে। কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি নিজের প্রয়োজনে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তির দরবারে গেছেন বা কিছু আবেদন করেছেন, তখন নেতারা বিরক্ত হয়েছে। পরবর্তিতে পেছনে কটু কথা বলতে ছাড়েনি। সেই কটুবাক্যই বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা দেরকে অপছন্দের মূল কারন হয়ে উঠেছে। সংসদ বা নেতাদের দরবার গুলোতে সব সময় লোকজনের ভীড় লেগে থাকে। সেধরনের কটুবাক্য তাদের কাছ থেকে ছড়াতে ছড়াতে বিষয়টা তিল থেকে তাল হয়ে গেছে। এটা দু’একদিনের ঘটনা নয়, বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে মুক্তিযোদ্ধাদের অহেতুক আবদার কারি, অকর্মা অযথা অর্থ সাহায্য প্রার্থনাকারি হিসেবে সমাজের কাছে উপস্থাপন করায় আজ দেশের বীর সৈনিকদের এই অবস্থা। অথচ কোন মুক্তিযোদ্ধা হয়তো সেসময় বড় অভাবের তাড়নায় বা চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনে সেই নেতা বা সংসদের দরবারে গিয়েছিলেন।

৭১ রের মুক্তিযুদ্ধে, শহরের চেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা ছিল গ্রামের দামাল ছেলেরা। যাদের সিংহভাগ আবার ছিল অশিক্ষিত। যুদ্ধে জয়লাভ করা অনেক বীর যোদ্ধা, জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ভিক্ষা বা সাহায্যের জন্য পরিচিত বা বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরত। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের কারনটায় পরে আসছি। বীর যোদ্ধারা কেউ কেউ নিজের কর্ম সংস্থান বা সন্তানদের একটা চাকরি কিংবা লিখাপড়ার সহায়তা চাইতো। এই বিষয়টাকে অহেতুক সুবিধা নেওয়ার উপমা দেয় অসাধু স্বাধীনতা বিরোধি চক্র এবং যুদ্ধের সময়কার লুটেরা চক্র। তারা যোদ্ধাদের নামে অপবাদ ছড়িয়ে অবস্থা এমন তৈরি করে যে, বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের এখন শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শোনা যুদ্ধের পর এই দেশের সম্ভ্রান্তদের জমি বা জায়গা ছাড়া আর কিছু ছিল না, কিন্তু লুটেরাদের অর্থ ও দাপট ছিল তুংগে। লুটপাটের গোপন তথ্য ফাস হয়ে যাবার ভয়ে লুটেরার দল উল্টো দেশের বীর সন্তানদের নামে অপবাদ ছড়াতো। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন যুদ্ধে পরাজয়ে এবং প্রজন্মের কাছে তাদের শত্রুতে রুপান্তর করার প্রধান কারন এটাও একটা।

আজকে যারা মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লম্বা লম্বা ভাষণ দেন। তাদের কতজন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তৎকালিন সেনা বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সত্যি করে বলুন তো। আদৌ কি সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা আছে। যেই দেশকে মুক্ত করতে বঙ্গবন্ধুর এক ডাকে জীবন যৌবনের মায়া, ঘর সংসার ফেলে যারা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। প্রাণ দিয়েছিল লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা। সেই স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ দেশের ওই সব বীর যোদ্ধাদের কথিত অস্ত্র উদ্ধারের নামে খুঁজে খুজে গ্রেফতার করে ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। মাসের পর মাস ধরে চালায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ৭৫রের পর মুক্তিযোদ্ধাদের উপর চালেছে বর্বরতা নির্যাতন। যার বর্ননা শুধু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারই দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধাদের না পেলে তাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের উপরেও অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল। সে সময় হাজার হাজার বীর যোদ্ধাদের মানসিক ও শারীরিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। যাতে তাদের দেখে, আর কখনও কারো মনে সাহস না জাগে। নির্যাতন করা হয়েছিল বীর বাঙ্গালীর মনবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য। তাদের বারবার অত্যাচারে, বাংলার বিজয়ী সন্তানরা হার মেনে নেয় জীবন যুদ্ধে।

তারপর দীর্ঘদিন আড়ালে চলে যায় মুক্তিযোদ্ধারা। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়। লোকমুখে বিভিন্ন রকম অপপ্রচার চলান হয়, শেখ মুজিব ও তার পরিবার নিয়ে। গ্রামগঞ্জের সাধারন মানুষের মধ্যে ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে কৎসা ছড়ানো হয়। পরিবর্তনের বেলায় সাধারন মানুষ সেসব মিথ্যা কুৎসা বিশ্বাস করে ফেলে। আজকাল টিভির টোকশো গুলোতে মুক্তিযুদ্ধে কোন দলের কার কতটুকু অবদান ছিল সে নিয়ে বিতর্ক চলে, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক নিয়ে বিতর্ক হয়। এমন একজনের নেতৃত্ব নিয়ে উচ্চবাচ্চ হয়, যে কিনা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর বিভীষিকা হয়ে নেমেছিল সেই ৭৫রে। কই, কেউতো সেই ববর্র নির্যাতন এবং অমানবিক অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে কিছু বলে না।

মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পায়, মুক্তিযোদ্ধারা পরিবাহনের টিকিট ও হাসপাতালে সুবিধা পায়, তাদের সন্তানেরা কোটা সুবিধা পায়, এগুলো এখন সবার রাগের কারন, চোখের বালি। অথচ এসব কোন বিষয় নয়, শুধু স্বাধীনতা বিরোধি চক্রের ছড়ান বিভ্রান্তি। দেশের তৃতীয় চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারিরা পেনশন পেতে পারলে মুক্তিযোদ্ধারা কি তার থেকে নিম্ন কিছু? প্রশাসন বা সামরিক বাহিনার সদস্যরা যদি যোগাযোগ, চিকিৎসা, রেশন সুবিধা পেতে পারে, পেনশন পেতে পারে, তাহলে যারা দেশে এই পদগুলো তৈরির রাস্তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে তাদের কি কোন অধিকার নেই? শিক্ষা বা চাকরি ক্ষেত্রে সন্তানদের কোটা নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সেটা সরকারের সৃষ্টি। এতগুলো সন্তান খুঁজে পাওয়া সমস্যা, যত গুলো কোটা দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এত সংখ্যা রাখার প্রয়োজন ছিল না। যেটা পরবর্তিকালে তাদের বিতর্কের কারন হয়ে দাঁড়ীয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা কিন্তু একটা সম্মানী মাত্র, এটা তাদের প্রাপ্প। আমার জানা মতে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রজাতন্তিক দেশে এই প্রথা চালু আছে। এই টাকা দিয়ে সংসার চলে না, এই টাকা দিয়ে তাদের পরিবারের চিকিৎসা বস্ত্র তিনবেলা ঠিকমত অন্য হবে না। এটা শুধু একটা সম্মানী। চিকিৎসা ফ্রি হতে পারে ঔষধ তো ফ্রি না। কিন্তুু সব বুঝেও মানুষ মুক্তিযোদ্ধা নাম শুনলে নাক সিটকে উঠে। আমি মনে করি এটা সরকার এবং কতৃপক্ষের ব্যর্থতা।

সরকার হঠাৎ বলে উঠলো বাংলার ইতিহাস বিতর্কিত হয়েছে, কেন হয়েছে, কি ভাবে হয়েছে, কারা করেছে তার সঠিক তথ্যবহুল কোন বর্ননা নেই। তাহলে কে মানবে এই কথা। যারা এ নিয়ে তর্কবিতর্ক করছে তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত কারন সম্পর্কে জানেন বা গবেষনা করেন সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এখন দলের চামড়া বাঁচাতে নানা জন নানা রকম তর্কবিতর্ক করছে অহেতুক। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভে যেমন তাদের কোন অবদান ছিল না, তেমন প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার ও সংশোধনের খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না। কারন তারা চায় না কেচ খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসুক। আমি নিশ্চিত কতৃপক্ষ সাপকে ভয় পায়। এভাবেই হয়তো বিতর্কিত থেকে যাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিজয়ের ইতিহাস এবং বর্তমান প্রজন্মদের কাছে শত্রু রুপে রইবে দেশের বীর সন্তানরা বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

তবে একটা সত্যি যা কেউ কোনদিন বদলাতে পারবে না, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমান ভরা মঞ্চে হাজার হাজার মানুষের সামনে বাংলার স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। আর মুক্তিযুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করে লক্ষ লক্ষ শহিদের বিনিময়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল বাংলার বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। এখনও সেই মহান বিজয়কে ম্লান করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শত্রু পক্ষ। এবং তাদের ইন্ধনে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে এই দেশেরই অসংখ্য মানুষ। অনেক কে বলতে শুনেছি মাত্র নয় মাস যুদ্ধে করে খুব সহজে বিজয় পেয়েছে, তাতে এত লাফা লাফির কি আছে। কথাগুলো দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধি হচ্ছে কি না সেটা চিন্তাও করে না এখন মানুষ। যুদ্ধ মাত্র নয় মাস হয়েছিল বলে তারা তাচ্ছিল্য করছে, অথচ এটা চিন্তা করছে না, যুদ্ধ যদি আরও নয় মাস হতো তাহলে এই ভুখন্ডে বাঙ্গালীর অস্তিত্ব বলে কিছুই থাকত না। দেশ তো দুরের কথা, দশও খুঁজে পাওয়া যেত কি না সন্দেহ, তাদের জন্মও হতো না।

কখনও কখনও মনে হয় সেরকম হলেই বোধহয় ভাল হতো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন অবমাননাকর কথা অন্তত শুনতে হতো না। ভালমন্দ সব মিলিয়ে আমাদের বাংলাদেশ। সমস্যা আসবে সমস্যার সমাধানও আসবে। সুর্য উঠলেই বাংলাদেশের ৪৮তম বিজয় উৎসব বিজয়ের এই মাসে হঠাৎ খবরে দেখলাম এক বিখ্যাত রাজাকারকে শহিদ বলে উল্লেখ করে একটি পত্রিকা নিউজ কাভারেজ দিয়েছে, সেই পত্রিকার সম্পাদকে যদিও আজ গ্রেফতার করা হয়েছে, তারপরও কিন্তু থেকে যায় এই ধরনের মানুষ আর কত লুকিয়ে আছে আমাদের মধ্যে। কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, এই দেশে রাজাকার লুটেরার দল তখনও যেমন ছিল এখনও তেমনটি আছে।  তবে এই বাংলার মাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মত বীর সন্তানরা দেশ ও জনতার চোখের বালি হতে হয়তো আর জন্ম নেবে না।

শরিফুল ইসলাম আজাদ জয়
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য