যুক্তরাজ্যের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রচার চলাকালে প্রথম টেলিভিশন বিতর্কে কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির দুই শীর্ষ নেতা ব্রেক্সিট নিয়ে একে অপরের সঙ্গে বাহাসে জড়িয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বিচ্ছেদ নিয়ে চলমান ‘জাতীয় দুর্ভোগের পরিসমাপ্তির’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে টোরি নেতা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, বিরোধী লেবাররা এ বিষয়ে ‘কেবল বিভেদ ও অচলাবস্থার’ প্রস্তাব দিচ্ছে।

পাল্টা উত্তরে বিরোধী দল লেবারের নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, লেবাররা ব্রেক্সিটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ‘ব্রিটিশ জনগণের হাতে তুলে দিতে চায়’।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আইটিভির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কে দুই নেতা দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), আস্থা ও নেতৃত্ব, স্কটল্যান্ডের ভবিষ্যৎ এবং রাজপরিবার নিয়েও বিতর্কে জড়িয়েছেন বলে বিবিসি জানিয়েছে। তবে মঙ্গলবারের এ বিতর্কের প্রথমার্ধের বেশিরভাগ জুড়েই ছিল ব্রেক্সিট।

কনজারভেটিভ পার্টির নেতা জনসন ১২ ডিসেম্বরের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চান, এর মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে তার সমঝোতার চুক্তিটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস করে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দেশকে ইউরোপের জোট থেকে বের করে আনতে এবং ব্রাসেলসের সঙ্গে একটি স্থায়ী বাণিজ্য চুক্তি করতে আগ্রহী।

করবিন জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি জনসনের করা চুক্তিটি ছিড়ে ফেলে ইইউ’র সঙ্গে স্বতন্ত্র জোট ও একক বাজার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি করবেন; এরপর সেই চুক্তির ব্যাপারে জনগণের সম্মতি নিতে নতুন আরেকটি গণভোট দেবেন।

ব্রেক্সিট পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা- এনএইচএসের পরিণতি নিয়ে দুই নেতা তুমুল তর্কে জড়ান। করবিন টোরি নেতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, “আপনি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্তরাষ্ট্র ও বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিতে চাইছেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ নিয়ে ‘বেশ কয়েকটি গোপন বৈঠকের’ সম্পাদিত বিবরণও উত্থাপন করেন তিনি। সেসব বিবরণে কনজারভেটিভ সরকার ‘এনএইচএসে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যসামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকারের’ প্রস্তাব দিয়েছে বলেও অভিযোগ তার।

এর উত্তরে জনসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এনএইচএস তুলে দেওয়ার এ অভিযোগ লেবারদের ‘পরম আবিষ্কার’। কোনো অবস্থাতেই এ সরকার কিংবা কোনো কনজারভেটিভ সরকারই এনএইচএসকে বাণিজ্য দরকষাকষির টেবিলে তুলবে না।

ব্রেক্সিট ভবিষ্যতে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে কিনা- এ নিয়েও তর্কে জড়ান দুই নেতা। টোরি শীর্ষ নেতার দাবি, এসএনপির সমর্থন পেতে লেবাররা স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে আরেকটি গণভোটের প্রস্তাবে রাজি হতে পারে। স্কটিশদের সমর্থন পেতে তিনি অন্তত এ মূল্য চুকাতে রাজি নন, মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর।

পাল্টা উত্তরে করবিন জনসনের এমন ভাষ্যকে ‘ছাইপাশ’ অ্যাখ্যা দিয়ে তারা দল এসএনপি’র সঙ্গে জোট গড়ার কথা চিন্তা করছে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ‘ঠিক আছে’ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে লেবার পার্টির এ নেতা বলেছেন, “এর খানিকটা উন্নতি ঘটানো দরকার।”জনসনের ভাষ্য, “রাজপরিবার নিন্দা বা ভর্ৎসনার ঊর্ধ্বে।”

সঞ্চালক দুই নেতাকে রানি এলিজাবেথের দ্বিতীয় সন্তান প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধুত্ব নিয়েও জিজ্ঞাসা করেছেন।“খুবই গুরুতর কিছু প্রশ্ন উঠেছে, যার উত্তর পাওয়া জরুরি। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন,” বলেছেন করবিন। কনজারভেটিভ নেতার কণ্ঠেও প্রায় একই সুর, “আইনের অবশ্যই তার নিজের পথে চলা উচিত।”

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রথম এ টিভি বিতর্কে কোন নেতা বিজয়ী হয়েছেন, তা স্পষ্ট হওয়া না গেলেও দর্শকরা করবিন ও জনসনের বেশ কিছু মন্তব্যে আমোদ পেয়েছেন। জরিপ সংস্থা ইউগভের তাৎক্ষণিক এক জরিপেও দর্শকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা গেছে। “বেশিরভাগ লেবার ভোটারের মতে করবিন জিতেছেন, অন্যদিকে, কনজারভেটিভরা ভাবছেন জিতেছেন জনসন,” বলেছে তারা।

স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা নিকোলা স্টারজেন বলেছেন, আইটিভি’র এ বিতর্ক তাকে মোটেও সন্তুষ্ট করেনি। জনসন-করবিনের কেউই যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নয় বলেও মন্তব্য তার।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা জো সুইনসন দুই নেতার বিভিন্ন বিষয়ের উপস্থাপনকে খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, “উভয়েই তর্জন-গর্জন ও আলোচনা ঘুরিয়ে দেওয়ায় মনোযোগী ছিলেন।”

গ্রিন পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা সিয়ান বেরি ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নিয়ে আলোচনা বিতর্কের শেষের দিকে থাকায় এবং তা দ্রুত শেষ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ব্রেক্সিট পার্টির নেতা কট্টরপন্থি নাইজেল ফারাজ বলেছেন, করবিন ‘বিতার্কিক’ হিসেবে ভাল হলেও ভবিষ্যতে ব্রেক্সিট নিয়ে কোনো গণভোট হলে বিচ্ছেদের পক্ষে না বিপক্ষে থাকবেন সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেননি।

বিতর্কে কনজারভেটিভ পার্টির অন্যতম টুইটার অ্যাকাউন্ট ‘ফ্যাক্টচেকইউকে’ নিয়েও টোরিরা সমালোচনার মুখে পড়েছে। এদিনের বিতর্কে এসএনপি ও লিবারেল ডেমোক্রেট দলের শীর্ষ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত না করায় দল দুটি আইটিভির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও লাভ হয়নি।

বিবিসি আগামী ৬ ডিসেম্বর সাউথহ্যাম্পটনে জনসন ও করবিনের মুখোমুখি বিতর্কের আয়োজন করেছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য