ভারতের রাজধানী দিল্লির দূষণের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিল্লিবাসীর প্রতিটি শ্বাসেই যেন ফুসফুসে প্রবেশ করছে মারণ বাতাস। দূষণের মাত্রা যেন ক্রমেই বাড়ছে। রবিবার দিল্লিতে দূষণের মাত্রা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। দূষণের ফলে কম দৃশ্যমানতার কারণে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ৩২টি বিমানের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার ১২টি বিমানও ছিল। দিল্লি বিমানবন্দরের এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

শনিবার যেখানে দিল্লিতে দূষণের মাত্রা ছিল ৪০৭, সেখানে রবিবার বাতাসে বায়ু দূষণের সূচক বা একিউআই বেড়ে ৬২৫-এ পৌঁছে যায়। গোটা শহরজুড়ে এতোটাই ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে যে, শ্বাস নেওয়াও দুষ্কর হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই পরিস্থিতিকে অসহনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, দিল্লির মানুষ এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাতে তাদের কোনও দোষ নেই।

রবিবার দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতেও দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি ছিল। উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় দূষণের কারণে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ‘উত্তর ভারতজুড়ে দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। নগরবাসীও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দিল্লির মানুষ তাদের কোনও দোষের জন্য এই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন না। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীও এই দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ত্রাণ সরবরাহের পদক্ষেপও নেওয়া উচিত। দূষণ রোধে কেন্দ্রের নেওয়া সব উদ্যোগে আমরা সমর্থন দেবো।’

সোমবার সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির বাতাসের গুণমান পরীক্ষা করে দেখবেন। প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে খড়-পোড়ানোর জন্যে সৃষ্ট দূষণ সম্পর্কে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বা ইপিসিএ-র কাছ থেকে একটি প্রতিবেদন আদালত পর্যালোচনা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আদালতকে কেন্দ্রশাসিত রাজ্যগুলোতে বর্জ্য জ্বালানি, শিল্প থেকে বিষাক্ত নির্গমন এবং নির্মাণ প্রকল্প থেকে ধুলাবালি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা জারির পরামর্শ দিয়েছে।

পাঞ্জাব বা হরিয়ানায় কৃষকরা খড় পোড়ানোর ফলে প্রতি শীতে দিল্লি ও আশেপাশের অঞ্চলে এই সংকট দেখা দেয়। তবে এমন অভিযোগ উঠলেও ওই দুই রাজ্যের তরফ থেকে কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উভয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই দূষণ রোধে কেন্দ্রীয় সরকারকে নেতৃত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পরামর্শ দিয়েছেন কেজরিওয়াল। তবে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

রবিবার বিকালে এক ভিডিও ভাষণে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা দূষণ রোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। সবাই একত্রিত হয়েছিল এই প্রক্রিয়ায়। তা সত্ত্বেও কেন আমরা এই ঝক্কি নেবো? সবাই সম্মিলিতভাবে বসে আলোচনা করুন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ২৭ লাখ কৃষক রয়েছেন। আমরা কিভাবে তাদের সবার কাছে পৌঁছাবো? এই সমস্যার সমাধান করতে আমাদের আরও কত বছর সময় লাগবে? এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

এদিকে দিল্লি সোমবার থেকে জোড়-বিজোড়-রোড রেশন স্কিম শুরু করছে। এটি চলবে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। এই নিয়ম অনুযায়ী, একদিন পর একদিন দিল্লির রাস্তায় চলবে জোড়-বিজোড় রেজিস্ট্রেশন প্লেটযুক্ত যানবাহনগুলো। এছাড়া মঙ্গলবার পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে সেখানে।

জানুয়ারির পর থেকে এই প্রথমবার দূষণের মাত্রা জরুরি পর্যায়ে পৌঁছায়। পরিবেশ দূষণ (প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ) কর্তৃপক্ষ শুক্রবার দিল্লির এই দূষণের প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

শনিবার দিল্লির উপ-মুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ ,বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে তিনবার বৈঠক স্থগিতের জন্য অভিযুক্ত করেন। ১২ সেপ্টেম্বর, ১৭ অক্টোবর এবং ১৯ অক্টোবর, তিনবার বৈঠকের জন্যে দিন ঠিক হয়েও তা বাতিল হয়ে যায়। সিসোদিয়া কটাক্ষ করে বলেন যে, রাজধানীতে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরের কোনও সময়ই নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য