শাসকগোষ্ঠীর রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে জনগণের তুমুল প্রতিবাদে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার কথা জানিয়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এ ঘোষণা দেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বৈরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হিজবুল্লাহ ও আমাল মুভমেন্টের সমর্থকদের হামলা ও আন্দোলনকারীদের একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার কিছু সময় পর হারিরি প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেওয়ার এ ঘোষণা দেন।

“১৩ দিন ধরে লেবাননের জনগণ অর্থনীতির ক্রমাবনতি রোধে একটি রাজনৈতিক সমাধানের সিদ্ধান্ত জানতে অপেক্ষ করেছে। জনগণের কথা শুনে এই সময়ের মধ্যে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করেছি আমি।

“সময় এসেছে সংকটের মুখোমুখি হয়ে আমাদের বড় ধরনের একটি ধাক্কা খাওয়ার। রাজনৈতিক জীবনের সকল অংশীদারদের বলছি, আমাদের আজকের দায়িত্ব হচ্ছে, কীভাবে আমরা লেবাননকে রক্ষা করবো এবং এর অর্থনীতির পুনরুত্থান ঘটাবো তা বের করা,” পদত্যাগের ঘোষণায় বলেছেন সাদ আল-হারিরি।

লেবাননের সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগ করলেও নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত বর্তমান সরকারই অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবে।

হারিরির পদত্যাগের পরপরই নতুন সরকার গঠনের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা।

এর আগের দফায় নয় মাসের আলোচনা শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফিউচার মুভমেন্ট পার্টির শীর্ষ নেতা হারিরির সদ্য পদত্যাগী মন্ত্রিসভা দায়িত্ব নিয়েছিল।

মঙ্গলবার রাতেই বিক্ষোভকারীরা বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে ফিরে এসে লেবাননের পতাকা উড়িয়ে হারিরির পদত্যাগে সন্তোষ জানায়।

অনেকেই একে ’১৭ অক্টোবরের আন্দোলনের’ বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন। বিক্ষোভকারীদের ক্যাম্পে হামলার ঘটনা আন্দোলনকারীদের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে বলেও হুঁশিয়ারি তাদের।

“যা ঘটেছে তা আমাদের শক্তির ইঙ্গিত দেয়। দুর্বৃত্তরা যদি সংখ্যায় আরও বেশি হয়ে আসে, তাহলে আমরাও বেশি আসবো। ভেঙে দেয়া তাবু সহজেই আবার বানানো যাবে,” বলেছেন বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কমল রিদা।

মঙ্গলবার বৈরুতের সড়কগুলোতে কালো পোশাক পরিহিত একদল মানুষ লাঠি ও পাইপ হাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলে পড়ে।

ইরান সমর্থিত সশস্ত্র হিজবুল্লাহ বাহিনীর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ গত সপ্তাহে বিক্ষোভের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কগুলো খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর এ হামলার ঘটনা ঘটল।

বিদেশি শত্রুরা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে লেবাননে এই বিক্ষোভে অর্থায়ন করছে বলেও নাসরাল্লাহ অভিযোগ করেছিলেন।

হিজবুল্লাহ ও আমাল মুভমেন্টের সমর্থকরা মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীদের বেশ কয়েকটি তাঁবু জ্বালিয়েও দেয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

তারা নাসরাল্লাহর পাশাপাশি আমাল মুভমেন্টের নেতা ও পার্লামেন্টের স্পিকার নবি বেরির সমর্থনে স্লোগানও দেয়।

শুরুর দিকে নিরাপত্তা রক্ষীরা হামলাকারীদের বাধা না দিলেও পরে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে দুপক্ষকেই ছত্রভঙ্গ করে দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

২০০৮ সালে সাদ হারিরির পৃষ্ঠপোষক ও তার মিত্রদের হটিয়ে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের রাজধানী দখলের পর বৈরুতে এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম।

হারিরির ভাষণে অবশ্য এ হামলার প্রসঙ্গটি আসেনি।

হারিরির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফ্রান্স লেবাননের সবার প্রতি জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে লেবাননের জনগণের চাহিদায় সাড়া দিয়ে দেশটিতে নতুন একটি সরকার গঠনে তাড়া দিয়েছেন।

“লেবাননের জনগণ একটি দক্ষ ও কার্যকর সরকার চাইছে। চাইছে অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতির রাহু থেকে মুক্তি,” বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন রাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি প্রভাবশালী দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হারিরির এ পদত্যাগ লেবাননের রাজনৈতিক সংকট আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা পর্যবেক্ষকদের। ফিউচার মুভমেন্টের শীর্ষ এ নেতা পদত্যাগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন একটি সরকার গঠন প্রক্রিয়াকে জটিলতায় ফেলে দিতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

১৯৭৫-৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি বর্তমানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।

হারিরির পদত্যাগ লেবাননকে একটি অনিশ্চিত চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং এই সুযোগে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ দেশটিতে আরও শক্ত আসন গাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেরকমটা হলে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটির পক্ষে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।

ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অংশীদার হিজবুল্লাহ অবশ্য শুরু থেকেই হারিরি ও সরকারের পদত্যাগের বিরোধী ছিল।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য