দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দিনাজপুর শহরের কালিতলায় এইচ কে মাদার কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় এক প্রসুতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ওই হাসপাতালে রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ করলে হট্টগোল শুরু হয়, পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।

এই ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডাঃ হযরত আলী আত্মগোপনে রয়েছেন। এর আগেও এই চিকিৎসক কর্তৃক রোগী মৃত্যুর অভিযোগ এবং অপারেশনের সময় কিডনি কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ গর্ভপাত ঘটানোর মামলায় তার ৯ বছর সাজাও হয়েছিল।

নিহত রোগীর নাম মুনতাহীনা পারভীন (২৫)। তিনি সদর উপজেলার ৩ নং ফাজিলপুর ইউনিয়নের উত্তর হরিরামপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের স্ত্রী। সোমবার রাত ৮ টার সময় কোতয়ালী সামনে এইচ কে মাদার কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে এই ঘটনা ঘটে।

রোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর মুনতাহীনা ও আব্দুল মান্নান দম্পতিকে সন্তানের জন্য ১১ বছর অপেক্ষা করতে হয়। তাই প্রথম সন্তানের বেলায় কোন ঝুঁকি নিতে চাননি এই দম্পতি। প্রসব ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত ১৭ অক্টোবর দুপুর ১২ টার সময় শহরের কালিতলায় কোতয়ালী থানার সামনে এইচ কে মাদার কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে ভর্তি করানো হয়। সেদিন রাত ১০ টায় প্রসুতি মাতা মুনতাহীনার সিজার করা হয়। এ সময় একটি কন্যা সন্তানের মা হন মুনতাহীনা।

প্রথম সন্তান হওয়ায় পরিবারে বইছিল আনন্দের বন্যা। গত ২০ অক্টোবর মুনতাহীনাকে রিলিজ দেয়া হয়। রোগীর স্বজনরা না চাইলেও এক প্রকার জোর করেই রিলিজ দেয়া হয় মুনতাহীনাকে। কারণ চুক্তিতে সিজার করা হয়েছিল। পরের দিন ২১ অক্টোবর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে মুনতাহীনাকে আবারো এইচ কে মাদার কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নিয়ে আসা হয়। এ সময় রোগীর পেট অম্ভাভাবিক ভাবে ফুলছিল ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।

কিন্তু একাধিকবার বলার পরও রোগীর সিজারকারী চিকিৎসক ও এইচ কে মাদার কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের পরিচালক ডাঃ হযরত আলী রোগীকে দেখতে আসেননি। তার ছেলে মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ তারিফ-উল-ইসলাম রোগীকে দেখে চিকিৎসা দেন। রাত ৮ টার সময় প্রসুতি মাতা মুনতাহীনা মারা যায়।

এ সময় রোগীর স্বজনেরা আহাজারি শুরু করলে আশে পাশের লোকজন ছুটে আসে। মুনতাহিনার বাবার বাড়ি শহরের পাটুয়াপাড়া এলাকায়। সেখান থেকেও লোকজন এসে হাসপাতালে চিৎকার চেচামেচি শুরু করে। এ সময় হাসপাতাল, চিকিৎসক ও স্টাফদের উপর হামলার অবস্থা হওয়ার আশক্সকায় পুলিশকে খবর দেয়া হলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

নিহত মুনতাহীনার মামা শ্বশুড় আব্দুল জলিল বলেন, ভূল অপারেশন হয়েছিল নাকি পেটের ভিতরে কোন অঙ্গ প্রতঙ্গ কেঁটে ফেলেছিল তা চিকিৎসকই বলতে পারবেন। তবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোগীকে রিলিজ দেয়া হয়। এর আগে রোগীকে পেটে বাচ্চার অবস্থা ভাল নয় বলে জোর করে সিজার করানো হয়।

আবার চুক্তিতে সিজার করায় ঠিকমত কেয়ার নেয়া হয়নি এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ দেয়া হয়নি। চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো জানান, সিজারের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরিক্ষা করা হয়নি। ৬ মাস আগের রিপোর্ট দেখে সিজার করা হয়েছে।

মুনতাহীনার বোন অভিযোগ করে বলেন, এখানকার চিকিৎসায় কোন ব্যাঘাত ঘটেছে। যার কারনে জোর করে রিলিজ দেয়া হয়েছিল। ডাক্তার নিজেই এ্যানেশতেশিয়া করেছে। চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটায় আগে শ্বাসকষ্ট না থাকলেও অপারেশনের পরে রোগী শ্বাসকষ্ট হয়ে মারা গেছে। আমার বোনকে এরা মেরে ফেলেছে।

দিনাজপুর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুক্তি বাবু বলেন, আমরা মনে করছি চিকিৎসকদের ভুলের কারনে রোগী মারা গেছে। পোষ্ট মর্ডেম করা হলে এক চিকিৎসক অন্য চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিবেন না বলে আশঙ্কা করছি। হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা থাকলেও সিজার করানো হচ্ছে। তবে কোন ক্লিনিকে যাতে করে এমন রোগী মৃত্যুর ঘটনা না ঘটে এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আক্ষেপ করে বলেন, সেবা না পেয়ে আমাদেরকে লাশ নিয়ে যেতে হচ্ছে।

রোগীর সিজার করেছিলেন চিকিৎসক ডাঃ হযরত আলী। তবে ঘটনার পর থেকে তাকে পাওয়া যায়নি, তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোথায় আছেন তা সাংবাদিকদেরকে জানানো হয়নি। তবে হাসপাতালের নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক ষ্টাফ জানান, ঘটনার পর থেকে ডাঃ হযরত আলী হাসপাতালে আসেননি।

এ ব্যাপরে জানতে চাইলে মেডিকেল অফিসার ডাঃ তারিফ-উল-ইসলাম বলেন, রোগীকে সুস্থ্য অবস্থায় রিলিজ দেয়া হয়েছিল। পরে আমাদেরকে মোবাইলে জানানো হয়েছে রোগীর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আজ (সোমবার) রোগীকে যখন নিয়ে আসা হয় তখন আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। অনেক কারনেই রোগী মারা যেতে পারে, তবে কি কারনে মারা গেছে তা আমরা বলতে পারছি না।

জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুছ কুদ্দুছ এইচ কে মাদার কেয়ার হাসাপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের অনুমোদন আছে কিনা তা জানাতে পারেননি। এমন কি প্রসুতি মৃত্যুর ঘটনাও তিনি জানেন না বলে জানান।

কোতয়ালী থানার ওসি রেদওয়ানুর রহিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, হাসপাতালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। নিহতের ঘটনায় আমাদেরকে মৌখিক ভাবে জানানো হলেও লিখিত কোন অভিযোগ করা হয়নি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য