রীতি মাফিক সাড়ম্বর আয়োজনে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহসানে আরোহণ করলেন জাপানের নতুন সম্রাট নারুহিতো।

আর নতুন সম্রাটের অভিষেকের মধ্যে দিয়ে জাপানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে নতুন ‘রেইওয়া’ যুগের সূচনা হল। রেইওয়া শব্দের অর্থ শৃঙ্খলা ও ঐকতান।

সম্রাট আকিহিতো সিংহাসন ত্যাগের পর তার ছেলে যুবরাজ নারুহিতো গত ১ মে প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্রাটের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন।

জাপানি রীতি অনুযায়ী নতুন সম্রাটের অভিষেকের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আচার পালন করতে হয় বলে পাঁচ মাস পর হলো মূল আনুষ্ঠানিকতা।

মঙ্গলবার দুপুরে টোকিওর ইমপেরিয়াল প্যালেসের ‘হল অব পাইনে’ রাজকীয় আয়োজনের মধ্যে দিয়ে জাপানের ‘তাকামিকুরা’ (চন্দ্রমল্লিকা) সিংহাসনে আরোহণ করেন ৫৯ বছর বয়সী নারুহিতো। এর মধ্য দিয়ে তিনি অভিষিক্ত হন জাপানের ১২৬তম সম্রাট হিসেবে।

রাজকীয় এই অনুষ্ঠানে স্ত্রী রাশিদা খানমকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তার পরনে ছিল পাঞ্জাবি, মুজিব কোট আর চাদর।

নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলিয়াম আলেক্সান্ডার, স্পেনের রাজা ফিলিপ, বেলজিয়ামের রাজা ফিলিপ, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেয়েল ওয়াংচুক, ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স চার্লস এবং মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিও অংশ নেন জাপানের নতুন সম্রাটের অভিষেকে।

নারুহিতো বাবা এমেরিটাস সম্রাট আকিহিতো ৮৫ বছর বয়সে গত ৩০ এপ্রিল স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেন। বয়স ও স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। আকিহিতোই প্রথম সম্রাট যিনি স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করলেন।

অভিষেকের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দিনের শুরুতে তিনটি ধর্মীয় উপসনালয়ে প্রার্থনা সারেন নতুন সম্রাট নারুহিতো। পরে সম্রাজ্ঞী মাসাকো ও পরিবারের সদস্যরা উপসনালয়গুলো প্রদক্ষিণ করেন।

স্থানীয় সময় বেলা ১টায় রাজপ্রসাদের হলে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। উনিশ শতকে তৈরি করা কমলা রঙের রাজকীয় পোশাক পরে ‘সেইডেন-মাৎসু-নো-মা’তে (সিংহাসন কক্ষ) প্রবেশ করেন সম্রাট নারুহিতো।

তার পেছনে সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার প্রতীক তলোয়ার, রত্ন এবং সিলমোহর নিয়ে প্রবেশ করেন রাজকীয় অধ্যক্ষ। এরপরই সম্রাজ্ঞী মাসাকো অনুষ্ঠানস্থলে আসেন জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘কিমোনো’ পরে।

সিংহাসন কক্ষে প্রবেশের পর বেগুনি রঙের পর্দা ঘেরা তাকামিকুরা সিংহাসনে বসেন নতুন সম্রাট। তার পাশে কিছুটা কম উচ্চতার মিচিডাই সিংহাসনে বসেন সম্রাজ্ঞী মাসাকো।

নির্ধারিত সময়ে দুজনের আসনের সামনে থেকে পর্দা সরে যায়। ড্রামের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই জাপানি কায়দায় ঝুঁকে সম্রাটকে সম্মান জানান। বিদেশি অতিথিরাও এ সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।

এরপর রাজকীয় ভাষণ দেন পরে সম্রাট নারুহিতো। ভাষণের সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ভাষণ শেষে জাপানি কায়দায় মাথা ঝুঁকিয়ে সম্রাটকে অভিবাবদন জানান আবে। সেখানে দাঁড়িয়েই নতুন সম্রাটকে অভিনন্দন জানিয়ে ভাষণ দেন তিনি।

ভাষণ শেষে শিনজো আবে হাত তুলে তিনবার উল্লাস ধ্বনি দেন। প্রাসাদের বাইরে এসময় তোপধ্বনি দেওয়া হয়।

রাজকীয় ভাষণে নিজের সিংহাসনে আরোহণের কথা ঘোষণা দিয়ে নারুহিতো বলেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করছি, বিধান অনুযায়ী দেশের এবং জনগণের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করব।”

সম্রাট বলেন, “আমার চিন্তা-চেতনায় সবসময় জনগণের সুখ এবং বিশ্ব শান্তির কামনা থাকবে।”

জাপানের সম্রাটের রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও তিনিই জাতীয় প্রতীক।

নতুন সম্রাটকে অভিনন্দন জানিয়ে শিনজো আবে বলেন, নতুন সম্রাটের নেতৃত্বে আমরা দেশকে আরও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাব। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তি কামনায় এবং বিশ্ব মানবের কল্যাণে অবদান রাখব।”

১৯৬০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া নারুহিতো রাজ পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে জাপানের বাইরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৯১ সালে ৩১ বছর বয়সে তিনি যুবরাজ হিসেবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত হন।

দুই বছর পর ১৯৯৩ সালে হাভার্ডে পড়া মাসাকোর সঙ্গে বাগদান হয় নারুহিতোর। ২০০১ সালে এ দম্পতির একমাত্র সন্তান প্রিন্সেস আইকোর জন্ম হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য