সিরিয়ায় রুশ সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি এবং রিয়াদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে মস্কোর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও জ্বালানি সহযোগিতা সত্ত্বেও দশককালের মধ্যে সৌদি আরবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রথম সফর মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ক্রমবর্ধমান প্রভাববৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

চার বছর আগে, ২০১৫ সালে সিরিয়ায় সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছিল।

তাদের ও ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত বাশার আল-আসাদ ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হন,মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ টপকে তিনি ফের সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

টানা কয়েক বছরের ওই গৃহযুদ্ধে আসাদবিরোধীদের সঙ্গেই সৌদি আরবের সখ্যতা ছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সিরিয়ার সংঘাতে রিয়াদ ও মস্কোর অবস্থান প্রতিপক্ষ শিবিরে হলেও পুতিনকে এবার রাজকীয় অভ্যর্থনাই দিয়েছে সৌদি আরব। সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটি যে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেও আগ্রহী, মিলেছে তারও ইঙ্গিত।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রুশ প্রেসিডেন্টের রিয়াদ সফরের আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নিয়ে ওই অঞ্চলে পুতিনের প্রভাববৃদ্ধির আরও সুযোগ করে দিয়েছেন।

মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সুযোগে তুরস্ক ওই এলাকায় কুর্দিবিরোধী অভিযান শুরু করে, যা থেকে বাঁচতে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এসডিএফ) পরে আসাদ সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে একটি চুক্তিতেও রাজি হয়। ওই চুক্তির সূত্র ধরেই কয়েক বছর পর কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অবাধে ঢুকতে পারছে ক্রেমলিনঘনিষ্ঠ সিরীয় সেনাবাহিনী।

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কোর দহরম মহরম দেখা যাচ্ছে।

কেবল সিরিয়াতেই নয়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে যে উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি হয়, তাতেও তেহরানের পাশেই রাশিয়াকে দেখা গেছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে উপসাগরে বিভিন্ন তেলবাহী ট্যাংকারে এবং সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের দুটি তেলের প্ল্যান্টে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাতে পশ্চিমারা ইরানকে দায়ী করলেও মস্কো সে সুরে গলা মেলায়নি। তেহরান শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে।

সোমবার সৌদি সফরে এসে পুতিন দেশটির বাদশা সালমান এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট আগে থেকেই এ দুজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলেও দাবি করে আসছিলেন।

টেলিভিশনে দেওয়া মন্তব্যে পুতিন ও সৌদি বাদশা সালমান দুজনই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় যৌথ বিনিয়োগের পাশাপাশি সিরিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাতের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে জানিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বলেছেন, জ্বালানি খাতে সৌদি আরব ও রাশিয়ার সহযোগিতা স্থিতিশীলতা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, তেলের বাজারের এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার সঙ্গে ওপেকের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব অপরিশোধিত জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে যখন থেকে ওপেক প্লাস জোটের সূচনা করেছিল, তখন থেকেই এ খাতে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে।

১৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারসহ সৌদি আরবের দুটি প্ল্যান্টে হামলার ঘটনার পর পুতিন সৌদি আরবকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা এস-৪০০ সরবরাহেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

সোমবার রিয়াদ সফরে আসার আগে তিনি ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সৌদি আরবের এস-৪০০ কেনার যে কোনো ধরনের আগ্রহ দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

তেহরানের হুমকি মোকাবেলায় পেন্টাগন এরই মধ্যে সৌদি আরবে ৩ হাজার নতুন সৈন্যর পাশাপাশি একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা পাঠানোরও ঘোষণা দিয়েছে।

গত বছর ইস্তাম্বুলের কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশুগজি হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লংঘনের নানান ইস্যুতে রিয়াদের ওপর মার্কিন কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞার চাপ ঠেকিয়ে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সৌদি আরবকে সতর্ক করেছেন।

রিয়াদের যে কোনো ‘বোকা’ পদক্ষেপ প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনেরই উপকার করবে, বলেছেন তিনি।

পুতিনের এবারের সফরে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যালস, যাতায়াত, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সসহ বিভিন্ন খাতে ডজনের বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সৌদি আরামকোর শেয়ার নিয়ে আগ্রহী দেখা গেছে রুশ ব্যবসায়ীদের; রাশিয়ার গ্যাজপ্রমও সৌদি আরবের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কবৃদ্ধিতে উৎসাহী।

অগাস্টে রিয়াদ কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ গম রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়ার সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের পথ ত্বরান্বিত হয়েছে। রাশিয়ার কৃষিখাতে বিনিয়োগ প্রকল্পের সন্ধানে যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে রুশ বিনিয়োগ তহবিল আরডিআইএফ ও সৌদি এগ্রিকালচার ও লাইভস্টক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (এসএএলআইসি)।

মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্যিক এসব লেনদেন যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন উদ্বিগ্ন করবে না বলেই আশা সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আদেল আল-জুবেইরের।

“রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলেই বিশ্বাস আমাদের। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত ও দৃঢ় বন্ধন রয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে আমরা সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে চাই,” বলেছেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য