মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও: বেশি দামে বিক্রির আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু সময়ের আগেই অঙ্কুর গজাতে থাকায় আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের শতাধিক চাষি ও ব্যবসায়ী। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করায় এবং দীর্ঘদিন মেশিন বন্ধ রাখায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাদাগঞ্জে অবস্থিত এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সাধারণ ধারণক্ষমতা এক লাখ ৬০ হাজার বস্তা (৮৪ কেজি প্রতি বস্তা)। কিন্তু এখানে সংরক্ষণ করা হয় প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার বস্তা। সরকারি হিসাবে প্রতি বস্তা ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ ২৪০ টাকায় চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংরক্ষণ করেন। ফলে ওই হিমাগার অল্প সময়ে আলুতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে সতেজ থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন মেশিন বন্ধ থাকার কারণে অল্প সময়ে আলু অংকুরোদগম (গজার) হয়ে যায়। এতে কম দামে আলু বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

ঠাকুরগাঁও হিমাগার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন, জেলায় ১৭টি হিমাগার আছে। আরও কয়েকটি নতুন নির্মাণ হচ্ছে। তাই সংরক্ষণের সময় অনেক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যে যত কত দাম নির্ধারণ করে তার হিমাগার তত দ্রুত ভর্তি হয়। শুনেছি এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কিছু আলু আগেই গজিয়ে গেছে। অন্য সব হিমাগারের আলু ভালো আছে।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি হিমাগার কর্তৃপক্ষ আলু সংরক্ষণের পরে বিদ্যুৎ বিল বাঁচানোর জন্য হিমাগারের মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ রাখে। ফলে অসময়ে আলুতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করে। এতে বাজারদর থেকে প্রতি কেজি আলু ৩-৪ টাকা কম দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। বিশেষ করে বীজ আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন আলু চাষিরা। মাঠে বোপনের সময় আরও প্রায় দুই মাস বাকি। চাষি ও ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন ছিল বীজ হিসেবে আলু বপন মৌসুমে অনেক ভালো দামে বিক্রি করবে। কিন্তু আলু অসময়ে গজার কারণে বীজের মান নষ্ট হওয়ায় খাওয়ার আলু হিসেবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেক চাষি কম দামে আলু বিক্রি করেছেন। অন্যরা বিক্রি করছেন।

সদর উপজেলার রহিমানপুরের মোড়ল ডোবা গ্রামের চাষি আবুল কাশেম বলেন, মাদাগঞ্জে অবস্থিত এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে ৩০০ বস্তা আলু রেখেছিলাম। ১৩ টাকা প্রতি কেজি বিক্রিও করেছিলাম। কিন্তু ব্যবসায়ীকে আলু দেওয়ার সময় গজানো আলু দেখে প্রতি কেজি তিন টাকা কম দাম দিয়েছে। এতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান দিতে হয়েছে।

ওই হিমাগারে চাষিদের থেকে আলু কিনে অনেক ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজে নিয়মিত ব্যবসা করি। এবার লোকসান হয়েছে। পেপারে নাম এলে মালিকতো তার প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা নাও করতে দিতে পারেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আলু হিমাগারে রাখার ফলে সতেজ থাকে। বপনের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে হিমাগার থেকে আলু বের করার পরে গজাতে শুরু করে। পরে জমিতে বপন করতে হয়। জেলায় গত মৌসুমে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল।

এস.বি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কোরবানির সময় প্রায় ২০ দিন বিদ্যুৎ না থাকার কারণে জেনারেটর দিয়ে মেশিন সবসময় চালানো সম্ভব হয়নি। সে কারণে কিছু আলু গজিয়ে যায়। অনেকে বিক্রি করে ফেলেছেন। কিছু চাষি ও ব্যবসায়ী তাদের আলুতে অঙ্কুর গজানোর বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। শুধু এস.বিতে নয় জেলার অনেক হিমাগারে এবার আলু গজায় গেছে। এটা নতুন কোনো বিষয় নয় বলে জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, বীজ আলু আগে গজানোর কারণে মান কিছুটা নষ্ট হয়। বীজ আলু খাওয়া ঠিক নয়। কারণ বীজ আলু বিষ দিয়ে শোধন করা থাকে। খাওয়ার আলুতে অঙ্কুর গজালে তেমন সমস্যা নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য