image_17041শেখ আব্দুল হাসনাত: অডিট রিপোর্ট দাখিলের পর পেরিয়ে গেছে পাঁচ পাঁচটি বছর। রিপোর্ট বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগই নেননি দিনাজপুর কলেজিয়েট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। উল্টো দুর্নীতিবাজদের পুরষ্কৃত করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
কলেজ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ২০০৬, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের আভ্যন্তরীণ অডিটের জন্য তৎকালীন বিদ্যোৎসাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী চৌধুরীকে আহবায়ক করে ২০০৯ সালের মে মাসে একটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, প্রভাষক শাহানা পারভীন, প্রভাষক সাদেকুল ইসলাম, শিক্ষক আশরাফ আলী ও শিক্ষক আব্দুল লতিফ। কমিটি পুঙ্খানুপুঙ্খু নিরীক্ষণ করে ঐ বছরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঐ বছরের ১২ নভেম্বর অধ্যক্ষ বরাবর অডিট রিপোর্ট পেশ করেন। এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, পাওনা আদায়েরও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং দায়ী ব্যক্তিদেরকে তাদের ঘৃণ্য অপরাধ হতে নিষ্কৃতি দেয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে আবার পুরষ্কৃতও করা হয়েছে। সূত্রটি জানায়, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট মোতাবেক, শ্রেণী শিক্ষক আলতাফ আলী চৌধুরী ২০০৭ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র বেতনের টাকা জমা না দিয়ে ৮ হাজার ১৫ টাকা আত্মসাৎ করেন। ২০০৮ সালে তার আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২৩৫ টাকা। ২০০৬ সালের রশিদ বই তার কাছে পাওয়া যায়নি। সেটি তিনি গায়েব করে দেন। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ কোতয়ালী থানায় একটি জিডি করেন। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত রশিদ বই উদ্ধার করা যায়নি। তবে গড় হিসাব করে ঐ বছরে আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ ধার্য করা হয় ১০ হাজার টাকা। ২০০৬, ২০০৭ এবং ২০০৮ সাল এই তিন বছরে তার কাছে পাওনা স্থিরীকৃত করা হয় ৩১ হাজার টাকা। এদিকে অবসরে চলে গেছেন ঐ শিক্ষক। আত্মসাৎকৃত ৩১ সহস্রাধিক টাকা আদায় না করেই তাকে দায় মুক্তি দিয়েছেন অধ্যক্ষ। কলেজ শাখার অফিস সহকারী মোঃ আফজালের কাছে প্রতিষ্ঠানের লুন্ঠিত অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭০ টাকা। আফজালের কাছে এ অর্থতো আদায় করা হয়নি, উপরন্তু তার বেতন ৫ শ’ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্কুল শাখার প্রধান অফিস সহকারী হাফিজুর রহমানের কাছে এ প্রতিষ্ঠানের পাওনা ২ লাখ ২৬ হাজার ৩১৬ টাকা। এ টাকা আদায়েরও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
একইভাবে প্রচুর টাকা আত্মসাৎকারী প্রধান অফিস সহকারী আব্দুর রহমানও অবসরে চলে গেছেন। তার কাছে পাওনা টাকা আদায় না করেই তাকে দায়মুক্তির সনদপত্র প্রদান করেছেন অধ্যক্ষ মোঃ হাবিবুল ইসলাম বলে শোনা যায়। এমনকি তার কাছ হতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পাওনা আদায়ের জন্য কোন পত্রও দেয়া হয়নি। হাফেজা খাতুন নামে একজন শ্রেণী শিক্ষিকার কাছে রক্ষিত বহি নং ৫৫ এর ৫৪৭৮ হতে ৫৪৮১ এই চারটি পাতা ছেঁড়া পাওয়া যায়। ২০০৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে ব্যবহৃত হতো ঐ বইটি। তার কাছ হতে পাওনা টাকার পরিমাণ ১৭ হাজার ৩৯০ টাকা। রিপোর্ট অনুযায়ী ভোকেশনাল শাখার সহকারী শিক্ষক আবছারুজ্জামান কাছ হতে ছাত্র বেতন বাবদ পাওনা দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৭৫ টাকা। ২০০৬ সালে সহকারী শিক্ষক আতিয়ার রহমানের কাছে ১৫ হাজার ৩০৫ টাকা, ২০০৭ সালে ১৯ হাজার ২৪৫ টাকা এবং ২০০৮ সালে ১৫ হাজার ৩৪২ টাকা সর্বমোট ৪৯ হাজার ৮৯২ টাকা পাওনা দাঁড়ায়। সহকারী শিক্ষক মনিমোহন রায়ের কাছে ২০০৬ হতে ২০০৮ পর্যন্ত ছাত্র বেতন বাবদ পাওনা দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৭৮৫ টাকা। জিবি সদস্য আতাউর রহমানকে দিয়ে রিভিউ কমিটি গঠন করিয়ে মনি মোহন রায়ের দায় স্থিরীকৃত করা হয় ২০ হাজার টাকা। যা এখতিয়ার বহির্ভূত। রিভিউ কমিটির কাল্পনিক দায় এর অর্ধেক ১০ হাজার টাকা তিনি ইতিমধ্যেই পরিশোধ করেছেন। বাকি ৬১ হাজার ৭ ৮৫ টাকার কোন খবরই নেই। এর দায় এবং দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জনাব হাবিবুল ইসলাম এবং জিবি সদস্য জনাব আতাউর রহমানকেই বহন করতে হবে।
পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎকারীদের মার্জনা করে দেয়া হয়েছে। যা কোনভাবেই বিধিসম্মত নয়। এভাবে দুর্নীতিবাজ শিক্ষক কর্মচারীদের শুধু মার্জনাই করা হয়নি তাদের কাউকে কাউকে পুরষ্কৃতও করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী বৃন্দের কাছ থেকে আদায় কৃত ২৯,২৫০/- টাকা আত্মসাৎকারী কামরুল হক এখন জিবি সদস্য। একজন দুর্নীতিবাজ কিভাবে জিবি সদস্য হতে পারেন সে প্রশ্ন এখন অভিভাবকদের মুখে মুখে। তারা বলছেন, আসলে এভাবেই দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ এবং জিবি কর্তৃপক্ষ।। দৃষ্টান্ত হিসাবে তারা আরো বলছেন কলেজিয়েট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের ভোকেশনাল শাখার শিক্ষকা হাফেজা খাতুনের কথা। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৩০৯ টাকা আত্মসাৎ করলেও তাকে আগামী জিবি সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অডিট কমিটির রিপোর্ট এতটাই নির্ভুল এবং পক্ষপাতহীন ছিল ছিল যে, ঐ কমিটির সদস্য ৮ম গ শাখার শ্রেণী শিক্ষক আব্দুল লতিফের কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ২০০৮ সালের পাওনা ৬৬৫ টাকাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আব্দুল লতিফ অডিট কমিটির সদস্য হওয়া সত্বেও এবং তার কাছে পাওনা সামান্য হলেও তাকে করুণা করা বা মার্জণা করা হয়নি। আরেকটি নগন্য পরিমাণ পাওনার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষক মোঃ শাহাদাত হোসেনের কাছে ২০০৭ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পাওনা ১১৮ টাকা। সেটিও অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা আছে। এ থেকেই বুঝা যায়, অডিট রিপোর্টটি কতটা নির্ভুল ও নিরপেক্ষ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সূত্রটি জানায়, ২০০৬ সালের আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে ছাত্র বেতন আত্মসাতের এমন মহা কেলেঙ্কারীর ঘটনা আর ঘটেনি। ২০০৬ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ হিসাবে যোগদান করেন মোঃ হাবিবুল ইসলাম। তিনি যোগ দেয়ার পর হতেই আত্মসাতের মহা কেলেঙ্কারী সৃষ্টি হতে শুরু করে। এর কারণ হলো, নিয়মিতভাবে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দেখভালের দয়িত্ব অধ্যক্ষের। কিন্তু অধ্যক্ষ হাবিবুল এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে এসেছেন সুপরিকল্পিতভাবে। কিন্তু কেন? অভিভাবকেরা বলছেন, এই অধ্যক্ষ নিজে একজন দুর্নীতিবাজ। কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তিনি নির্ধারিত বেতন স্কেলের অতিরিক্ত এক হাজার করে টাকা নিচ্ছেন – যার কোন বৈধতা নাই। তার নিয়মিত দুর্নীতির আরেকটি হলো, ছাত্রী ভর্তি। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ভর্তি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কিছুসংখ্যক ছাত্রীকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়। অনুত্তীর্ণদের অভিভাবকদের কাছ হতে ৫-৭ হাজার করে টাকা আদায় করে নিয়ে পরবর্তীতে তাদেরও ভর্তি করানো হয়। এভাবে আদায়কৃত টাকা কোন ব্যাঙ্ক একাউন্টে জমা দেয়া হয় না, ঐ টাকা সোজা গিয়ে ঢুকে অধ্যক্ষ মোঃ হাবিবুল ইসলামের পকেটে। অভিভাবকেরা বলছেন, অর্থের বিনিময়ে যদি ছাত্রী ভর্তি করাতে হয় তাহলে ভর্তি পরীক্ষার নাটক মঞ্চস্থ করার কি প্রয়োজন ছিল? তারা বলছেন, ইতিপূর্বে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। ইদানিং তিনি অর্থের বিনিময়ে অস্থায়ীভাবে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া শুরু করেছেন। ৩-৪ লাখ করে টাকা নিয়ে এই নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বরং চরম স্বেচ্ছাচারিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আনীত অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করা হয় জিবি সদস্য ও কলেজ শাখার প্রভাষক আল মাহমুদের সাথে। তিনি বলেন, তার মায়ের চিকিৎসা নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন। তার মা সুস্থ হয়ে উঠলেই তিনি মুখোমুখি কথা বলবেন।
অভিভাবক মহলের জিজ্ঞাসা, নাগরিক সমাজ আর প্রশাসন কি দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর দুর্নীতি নীরবেই সহ্য করে যাবেন? না কি, জেলার অন্যতম স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন? সুশীল সমাজ নীরব কেন? প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখার প্রভাষক সুফিয়া আক্তার নুরীকে আহবায়ক এবং স্কুল শাখার শিক্ষিকা মেরিনা লুৎফীকে সদস্য করে যে রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছিল সে রিভিউ কমিটির রিপোর্ট জন সম্মুখে প্রকাশের জোর দাবী জানিয়েছেন অভিভাবক মহল। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জনাব রুহুল আমিন ২০০৯ হতে এ যাবৎ জিবির বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদে অধিষ্ঠিত আছেন। তাঁর মত একজন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে অধ্যক্ষ হাবিবুল ইসলাম কিভাবে প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন ু এমন প্রশ্ন শুধু অভিভাবকদেরই নয়, শহরের সুধী মহলেরও। তারা বলছেন, এই দু’জনের মধ্যে সম্ভবতঃ কোন আঁতাত থেকে থাকতে পারে। না হলে কেন উপাচার্য জনাব রুহুল আমিনকে পুনরায় আগামী গভর্নিং বডিতে বিদ্যোৎসাহী সদস্য করার জন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দের এক সভায় প্রস্তাব রেখেছেন অধ্যক্ষ হাবিবুল ইসলাম?

কলেজিয়েট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী অভিভাবক বৃন্দের দাবী, অবিলম্বে অধ্যক্ষ বরাবর দাখিল কৃত ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮ সালের অডিট রিপোর্ট মোতাবেক অত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী ও অফিস সহকারীবৃন্দ কর্তৃক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে আত্নাসাত কৃত অর্থ আদায় এবং সেই সাথে দোষী ব্যক্তিদের শান্তি নিশ্চিত করানোর জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। অন্যথায় অত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দূর্নীতি মুক্ত করতে এবং সেই সাথে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বৃন্দের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নতি সাধনে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির দায়িত্ব জেলা প্রশাসক বরাবর হস্থান্তর করার জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন ছাত্রী অভিভাবক, সমাজের সূধীজন, সেই সাথে শহর বাসী এবং সর্বস্তরের জনগণ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য