Dinajpur-Jobeda-Maa-02শাহ্ আলম শাহী,দিনাজপুর থেকেঃ ইট ভাংছেন, জোবেদা খাতুন। স্বপ্ন নিজের একটা ভালো বাড়ি গড়ার। তাই, নিজের ঘর তৈরী’র ইট নিজেই ভাংছেন জোবেদা।  এতে এক দিকে অলস সময় কাটছে, অন্যদিকে খরচ কমছে জোবেদার স্বপ্নের বাড়ি তোলার।

এই জোবেদা খাতুন আর অন্য কেউ নয়, সময়ের আলোচিত সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমার মা। সাভারের রানা প্লাজার ধবংস স্তুপ থেকে ১৭ দিন পর উদ্ধারের পর যে রেশমা আলোচিত হয়েছেন বিশ্বজুড়ে। এই রেশমা’র গ্রামের বাড়ী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কোশিগাড়ীতে এখন বাড়ি তৈরীতে ব্যস্ত রেশমার মা। ইতোমধ্যে দু’টো পাকা ঘর তুলেছেন। আরও তিনটি পাকা ঘর তৈরীর প্রস্তুতি চলছে। এ কারণেই বাড়িতে বসে ইট ভাংছেন রেশমার মা। বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখের দিনে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে এসেছিলেন রেশমা। ছিলেন দু’দিন,দু’রাত্রী। না,এমনিতে আনন্দের বশে বেড়াতে আসেননি। এনেছিলেন লাশের সাথে।মৃত খালুর দাফন-কাফন ও দোয়া মাহফিলে। ৪ মাস পর গ্রামের বাড়িতে এসছিলো রেশমা।

খালু দুদু মিয়া থাকতেন গাজীপুরের চান্দুরা চৌরাস্তা মোড়ে। সেখানে রিক্সা চালিয়ে জীবীকা নির্বাহ করতেন তিনি। হঠাৎ তিনি মারা যান। সে সময় রেশমার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া মা ও বোন অবস্থান করছিলেন ঢাকায়। সেই সুবাদে খালুর মৃত্যুর খবর পান রেশমা। পহেলা বৈশাখ সকালে একটি পিকআপ ভ্যানে খালুর লাশ পাঠিয়ে দিয়ে সকালে  নিজে ও মা জোবেদা এবং বোন আসমাকে নিয়ে হানিফ এন্টারপ্রাইজ কোচে উঠে বিকেলে ঘোড়াঘাটে পৌছেন রেশমা। ছিলেন ২ দিন। মৃত খালুর দাফন-কাফন ও দোয়া মাহফিলের পর বুধবার বিকেলে আবার চলে যান ঢাকার উদ্দেশ্যে। যাওযার সময় ৩ হাজার টাকা দিয়ে যান মায়ের কাছে।

নতুন ঘর তোলার জন্য ফাকা জায়গায় মাটি ভরাট এবং বালু কেনার জন্য ওই টাকা দেন বলে জানিয়েছেন মা জোবেদা। মাসে মাসে দুই থেকে ৪ হাজার টাকা বিকোশের মাধ্যমে মায়ের কাছে পাঠায় রেশমা। সরকারীভাবে প্রাপ্ত ৫০ হাজার, রানা প্লাজার ৫০ হাজার এবং বাড়ি’র জমি সংক্রান্ত বিরোধের সমঝোতায় এক ব্যক্তির কাছে প্রাপ্ত ৫০ হাজার এই মোট দেড় লাখ টাকায় ২টি পাকা ঘর তুলেছেন রেশমার মা। আরও ৩টি ঘর তোলার প্রস্তুতি চলছে। রেশমার বাড়ির সামনের মহা-সড়কের ধারে স্থান পেয়েছে মৃতুঞ্জয়ী রেশমার ছবি সম্মিলিত বিশাল সাইন বোর্ড। রেশমা’র বাড়িতে এখন স্বাস্থ্য-সম্মত পায়খানা বসানো হয়েছে।

ঘোড়াঘাট উপজেলার  ৩ নং সিংড়া ইউনিয়নের কোশিগাড়ী গ্রামের কৃষক মৃত আনসার আলী ও গৃহিনী জোবেদা খাতুনের ২ ছেলে ৩ মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট রেশমা (২০)। বিয়ের পর স্বামী আব্দুর রাজ্জাক,মা জোবেদা,ভাই জয়েদুল, সাদেক ও মোঝো বোন আসমা সহ ৪বছর ধরে রেশমা অবস্থান করছে ঢাকায়। রেশমার মা জোবেদা তার সম্পর্কের এক নাতি আরজন আলীকে বিয়ে করে। রেশমা স্বামীর সাথে পৃথক হবার পর ৪ মাস আগ থেকে সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টেস এ কাজ শুরু করে । সাভারের রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ ছিলো রেশমা। তাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলো পরিবারের লোকজন। এ কথা স্¦স্তির নিঃশ্বাস ফেলে জানিয়েছেন গ্রামের বাড়ীতে অবস্থানরত রেশমার বড় বোন ফাতেমা (৩৫)। এখন তিনি আবেগে আপ্লুত। আনন্দে কেঁদে ফেলেছেন তিনি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান  মজিবর রহমান জানালেন, এ ঘটনার পর এলাকায় আনন্দের বন্যা বইছে। প্রশাসন, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন জন এখনও তাকে ফোন করে খবর নিচ্ছে। গ্রামের লোকজন জানতে চাইছে রেশমা এখন কেমন আছে।

স্থানীয় সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম আকাশ জানায়, রেশমা সারা বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু রেশমার জন্মস্থান দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে এখনও  তেমন কোন স্মৃতি স্থাপনা নির্মাণ হয়নি যা দেখে আমরা গর্ব করবো। রেশমার উন্নয়ন হলেও তার পরিবার এখন বেহাল দশায় দিনাতিপাত করছে। আমরা চাই, রেশমার পরিবারটিরও উন্নয়ন ঘটুক। রেশমার বড় ভাই জাহিদুল এখন ফেরি করে বারো ভাজা বিক্রি করছে। ছোট ভাই সাদেক ঢাকায় রিক্সা চালাচ্ছে। রেশমার পালিত বাবা আরজন আলী খাবার হোটেলে শ্রমিকের কাজ করছে। তাদের অবস্থার উন্নতি হলে আমরা স্বার্থক হতাম।

এদিকে রেশমার পালিত বাবা আরজন আলী জানায়, তাদের বাড়ির সামনে এক ব্যক্তি একটি ক্লিনিক তৈরী করছে। ক্লিনিকের প্রাচীর তাদের জায়গায় ঢুকে যাওয়ায় স্থানীয় সমঝোতা বৈঠকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে তাদের। ওই টাকা দিয়েই তারা আরও পাকা ঘর তৈরীর প্রস্তুতি নিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য