Dinajpur-Nokol Osudhশাহ্ আলম শাহী,দিনাজপুর থেকেঃ দিনাজপুরে আরও একটি নকল ওষুধের কারখানায় ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান ভেজাল ওষুধ এবং ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে।কারখানার মালিককে আটক করে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত।

App DinajpurNews Gif

সোমবার রাত সাড়ে ৯ টায় দিনাজপুর শহরের রাজবাটি এলাকায় বেঙ্গল আয়ুর্বেদিক ল্যাবটোরীজ নামে একটি ভেজাল ওষুধ তৈরী করখানায় এ অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব। সেখান থেকে উদ্ধার করে বিপুল পরিমান নকল ওষুধ ও ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম। এ সময় নকল ওষুধের কারখানার মালিক সাদেকুল ইসলাম স্বাধীনকে আটক করে র‌্যাব। কারখানার মালিক স্বাধীনকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত। এর আগে রাত ৯টায় শহরের চাউলিয়াপট্রিস্থ স্বাধীনের বাসভবনে ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব হানা দেয়। কিন্তু কিছুই সেখানে কিছু না পেয়ে পরে  শহরের রাজবাটি এলাকায় ভেজাল ওষুধ তৈরী করখানায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব। সেখান থেকে উদ্ধার করে বিপুল পরিমান নকল ওষুধ ও ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম।এ অভিযানে অংশ নেয় দিনাজপুরের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট তোমাল হোসেন ও ব্যারের কমান্ডিং অফিসার খালিদ হোসেনসহ র‌্যাবের জওয়ানরা।

উল্লেখ্য, গত বছর ভ্রাম্যমান আদালত ও র‌্যাব দিনাজপুর শহরের রাজবাটি এলাকায় একই স্থানে বেঙ্গল আয়ুর্বেদিক ল্যাবটোরীজ নামে এই ভেজাল ওষুধ তৈরীর করখানায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে বিপুল পরিমান নকল ওষুধ ও ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম। এ সময় নকল ওষুধের কারখানার মালিক সাদেকুল ইসলাম স্বাধীনকে আটক করে ২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ২ মাসের কারাদন্ড দিয়েছিলো ভ্রাম্যমান আদালত। স্বাধীন জামিনে বের হয়ে শুরু করেছে আবারও নকল ওষুধ তৈরীর এই রমরমা ব্যবসা। গত ১২ বছর ধরে নকল ও ভেজাল ওষুধের ব্যবসা করে স্বাধীন প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। ধরাও খেয়ে জেল-জরিমানা হয়েছে বেশ কয়েকবার। তার পরও ছাড়তে পারেনি এ ব্যবসা।।  অল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় স্বাধীনের রক্তের সাথে এই ব্যবসা মিশে গেছে বলে দাবী তার ঘনিষ্ঠ জনদের। Dinajpur-Nokol Osudh2

স্বাধীন এই অবৈধ ব্যবসা করে দিনাজপুর শহরে ৫টি বাড়ি,গাড়ী,ট্রাক্টর,টেম্পু,জায়গা,ব্যাংক ব্যলেঞ্জ গড়েছে। তার নকল ওষুধ তৈরীর কারখানায় পুলিশ.ডিবি পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি(বিডিআর),সেনাবাহিনী এবং ভ্রাম্যমান আদালত কমপক্ষে ১০ বার অভিযান চালিয়ে ভেজাল ওষুধ,ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম উদ্ধার এবং তাকে আটক করেছে। দিয়েছে জেল-হাজতে। রাজধারী ঢাকাতেও সে ভেজাল ওষুধ সহ ধরা পড়ে জেল খেটেছে। কিন্তু প্রতিবার জামিনে বের হয়েই আবারও শুরু করেছে এই অবৈধ ব্যবসা। গন্ডমূর্খ এই স্বাধীন ঢাকার মিটফোর্টে ভাংড়ির দোকানে বোতল ধোয়ার কাছ করতো এক সময়। টোকাই স্বাধীন হিসেবে সে সময় ছিলো তার পরিচয়। তার বাড়ি দিনাজপুর শহরের চাউলিয়াপট্রি  (কাঞ্চন ঘাট) এলাকায়। তার পিতা হাবিবুর রহমান হবি একজন সামান্য দুল-চুড়ি ফেরিওয়ালা ছিলেন। এখন বয়সের ভারে বাড়িতেই মুদি দোকান করেন।

স্বাধীনে মা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর স্বাধীনের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এ সময় মামাতো বোনকে অপহরনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। স্বাধীন পালিয়ে যায় ঢাকায়। সেখানে তার এক আত্মীয়র ভাংড়ির দোকানে কাজ নেয় বোতল ধোয়ার।  সেখানে খালি বোতল কিনতে আসা এক নকল ওষুধ প্রস্তুতকারীর সাথে তার পরিচয় হয়। গন্ডমূর্খ ধুরন্ধর স্বাধীনের পাল্টে যায় ভাগ্য। জড়িয়ে পড়ে নকল ওষুধ তৈরী চক্রের সাথে। দিনাজপুরে নিজেই শুরু করে এই ব্যবসা। এই অবৈধ ব্যবসায় উপার্জন করতে থাকে লাখ লাখ টাকা। এই অবৈধ অর্থ প্রদানের সুবাদে সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রশাসনের কতিপয় কিছু অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাথে।

দিব্যি বীরদর্পে চালাতে থাকে তার নকল ওষুধ তৈরী ও বাজারজাত করণ। এতে অল্প কিছু দিনে স্বাধীন লাখপতি থেকে কোটিপতিতে পরিনত হয়। এই অবৈধ টাকার জোর আর অবৈধ খুটির জোরে স্বাধীন ধরা পরার পরও বার বার পার পেয়ে যাচ্ছে। জব্দকৃত ভেজাল ওষুধের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পর তা ভালো বলে রিপোর্ট আসছে। একবার প্রশাসনের এক ব্যক্তি রাগ করে মানুষের মল( পায়খানা) প্যাক করে স্বাধীনের তৈরী ওষুধ বলে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পর তা ভালো হালুয়া বলে রিপোর্ট এসেছে। এমনও কথা চাউর আছে স্বাধীনের ক্ষেত্রে।

ভেজাল স্বাধীন অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি অনুমোদনবিহীন কথিত যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরী করে আসছে। ম্যান পাওয়ার (স্বচ্ছ তরল), ম্যান পাওয়ার (অস্বচ্ছ তরল), হর্স ফিলিংস, রয়েল টাইগার সহ নানা লোভনীয় নামে এসব সিরাপের প্রতি আসক্তি বাড়ছে বিভিন্ন বয়সী ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরণীদের মধ্যে। অনেকে ইয়াবার বিকল্প হিসেবে শরীরের উত্তেজনা বাড়াতে এসব সিরাপ পানে আসক্ত হচ্ছে। দিনাজপুর জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের আনাচে-কানাচে, অলিগলিতে যেকোনো দোকানে হাত বাড়ালেই মিলছে বিভিন্ন নামের তার তৈরী কথিত যৌন উত্তেজক সিরাপ। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলিগলির চা ও পানের দোকানেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব সিরাপ।

একটি বেসরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, এনার্জি ড্রিংকস নামে যেসব পানীয় বিক্রি হচ্ছে, তা হচ্ছে স্রেফ সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী পানীয়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালকোহল (মদ)। বোতলজাত বা টিনজাত উপাদানের তালিকায় এই অ্যালকোহলের আধুনিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘এনার্জি’। এগুলো পান করার পর শরীরে সাময়িকভাবে ভিন্ন ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে। যারা নিয়মিত খায় তারা ধীরে ধীরে এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। এসব সিরাপ নিয়মিত পান করলে কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি হয়। এসব সিরাপ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকস নামের যৌন উত্তেজক সিরাপের রাসায়নিক পরীক্ষা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে একটি প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভিগো-বি, ম্যান পাওয়ার (স্বচ্ছ তরল), ম্যান পাওয়ার (অস্বচ্ছ তরল), হর্স ফিলিংস, রয়েল টাইগার, ব্ল্যাক হর্স ও স্পিড নামের সাতটি পানীয়তে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে।

পানীয়গুলোর মধ্যে প্রথম চারটিতে ‘অপিয়াম অপিয়েট’ ও ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’ নামের রাসায়নিক দ্রব্য পাওয়া গেছে। এ দুটি দ্রব্য ‘ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। পরের তিনটি পণ্যে পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ক্ষতিকর উপাদান মেশানো এসব পানীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপিয়েট একধরনের নেশা বা নির্ভরতা সৃষ্টিকারী উপাদান। এমন উপাদানমিশ্রিত পানীয় পান করলে শরীরের ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি হয়, যখন শরীর উন্মুখ হয়ে থাকে কখন ওই উপাদান পাওয়া যাবে। আর সিলডেনাফিল সাইট্রেট ধীরে ধীরে যৌনশক্তি নিঃশেষ করে ফেলতে পারে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য