আনোয়ার হোসেন আকাশ, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাও : ঠাকুরগাওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাও ইউনিয়নের কলিগাও গ্রামের মৃত সাহাজত হোসেনের ছেলে ১২৭ বছর বয়সী আসিরউদ্দীন নামে এক কলিযুগের মানুষের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৬০ বছরকে অনেক পিছনে ফেলে আশিরউদ্দীন ১২৭ বছর বয়সেও স¤পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় চলাফেরা করতে পারেন। খালি চোখে দেখতে পান অনেকটায়, কানে শুনতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়না। মাথায় আধাপাকা চুল। নীচের মাড়ির দাঁত না থাকলেও উপরের মাড়ির সামনের দু’টি দাঁত ছাড়া সবকটি দাঁত হিরের মতো চকচক করছে। হালকা নরম মাংস চাবিয়ে খেতে পারেন। এখন পর্যন্ত মস্তিস্কের কোন প্রকার সমস্যা হয়নি।
বয়সের ভারে নেতিয়ে পড়া কলিগাও গ্রামের ১২১ বছর বয়সী একরামুল জানান, আশিরউদ্দীন’র দু’স্ত্রীর পাঁচ ছেলে চার মেয়ে। আশিরউদ্দীন কলিগাও গ্রামে বসবাস করলেও আদি পুরুষ ভারতে ছিল।

আশিরউদ্দীন অতিতের স্মৃতির পাতা খুলে জানান, জমিদারি প্রথা এবং  ইংরেজ শাসনামলের বিলুপ্তি হয় ১৯৪৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সাল ও ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিপক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের করুন কাহিনী বলতে গিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্থানী বাহিনীর স্থানীয় দোসরদের সহযোগিতায় সোমবার তার চোখ বেঁধে খুনিয়া দিঘি ধরে নিয়ে যায়। তাকে পিছন দিক থেকে অত্যাচার করে অমানবিকভাবে। পরের দিন মঙ্গলবার গ্রামডাঙ্গী গ্রামের মফিজউদ্দীনের সহায়তায় আশিরউদ্দীন বাড়ি ফিরে এসে তাৎক্ষনিক ভারত চলে যায়। ভারতের রায়গঞ্জ থানার বিষ্ণপুরে ১০ মাস থাকার পর আবার কলিগাও ফিরে আসেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটের কারনে খাওয়া চিকিৎসা ব্যয়ভার কষ্টকর হয়ে পড়েছে আশিরউদ্দীনের। বয়স্ক ভাতা পান আশিরউদ্দীন। ব্যাংকে ছেলের ঋণ থাকায় বয়স্ক ভাতার টাকা কেটে নেওয়া হয়। এতে আশিরউদ্দীনের সাংসারিক ব্যয় ভার কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আশিরউদ্দীনের সেজ ছেলে হামিদুল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ শেষে রেল ডিপার্টমেন্টে টিকিট মাষ্টারের চাকুরিতে যোগ দেওয়ার জন্য আক্কেলপুরের উদ্যেশে রওয়ানা হয়। দিনাজপুর জেলার পারবতিপুরে হঠাৎ পেটের ব্যাথা উঠলে চিকিৎসাধিন অবস্থায় সেখানে মারা যায়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাশ দাফন করা হয় বলে আশিরউদ্দীন জাতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।

ছেলে মেয়ের মধ্যে মেজ তফিজুল হক (৬৭) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতাও করে এসেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে ছোট ভাইয়ের লাশ দাফন ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা পায়নি স্বাধীনতাকামী পরিবারের লোকজন। নজর মোহাম্মদের পঞ্চম স্ত্রী ৪৭ বছর বয়সী রেবেকা স্বামীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বলেন, এবয়সেও তার স্বামী একাকি চলাফেরা করতে পারছে শুকরিয়া আল্লাহতায়ালার কাছে।
আশিরউদ্দীন ঘরের বারান্দায় চৌকির উপর থাকেন। পায়খানা প্রসাবের বেগ পেলে নিজেই নেমে পায়খানা প্রসাব সেরে আসেন।

আশিরউদ্দীন আমাদের প্রতিনিধির সাথে কথা বলার সময় আদিযুগের অনেক গল্প শোনান তিনি। মনে ইতিহাসের এ এক নীরব স্বাক্ষী। দুধের মধ্যে হাতের কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া, মাখন ঘিয়ের কোন অভাব না থাকার কথা জানালেন। সে সময় এক টাকায় ১০ সের চিনি আর এক মণ চাল বিক্রির গল্প বললেন।

কলিগাওয়ের কলিযুগের মানুষ ১২৭ বছর বয়সী আশিরউদ্দীন ও একই গ্রামের ১২১ বছর বয়সী একরামুল হকের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমি উনাদের একটি করে হুইল চেয়ারের ব্যাবস্থা করব শিঘ্রই।

শুধু ঠাকুরগাও জেলা নয় বৃহত্তর দিনাজপুর’র মধ্যে আশিরউদ্দীন’র চেয়ে বেশী বয়সী মানুষের সন্ধান মেলেনি। সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি আশিরউদ্দীন ১২৭ বছর বয়সে কলিযুগের মানুষ হয়ে শতাব্দির মাইল ফলক’র স্বাক্ষর বহন করছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য