ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন দুই গুরুত্বপূর্ণ হরমোন গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী মা ও সন্তানের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে; ভ্রূণের প্রতিস্থাপন, বিকাশ এবং সফলতার সাথে নবজাতকের জটিলতাবিহীন জন্ম এই হরমোনদ্বয়ের ওপর নির্ভরশীল।

যদিও গর্ভের সফলতার জন্য এই হরমোনদ্বয় অত্যাবশ্যকীয়, বিশেষভাব প্রজেস্টেরন, গর্ভাবস্থায় নানাবিধ অস্বস্তিকর উপসর্গগুলোর সূচনার জন্যও দায়ী। গর্ভাবস্থায় পরিপাকতন্ত্রের ওপর প্রজেস্টেরনের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রজেস্টেরন পরিপাকতন্ত্রের মাংসপেশির শৈথিল্যের জন্য বহুলাংশে দায়ী। মাংসপেশির শৈথিল্য খাদ্য পরিপাক এবং পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে খাদ্যের পরিভ্রমণের সময় বাড়িয়ে দেয় এবং প্রথমিকভাবে কোষ্ঠকাঠিন্যের সূচনা করে।

পরিপাকতন্ত্রের শৈথিল্যতা শুধু কোষ্ঠকাঠিন্যই নয়, কোষ্ঠকাঠিন্য সংশ্লিষ্ট জটিলতা, যেমন পাইলস্, ফিশার, থ্রোম্বস্থ পাইলসের সূচনা করতে পারে। এ ছাড়াও পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র মাংসপেশির শিথিলতা অজীর্ণ, বদহজম, অগ্নিমন্দার ন্যায় অস্বাচ্ছন্দ্যদায়ক উপসর্গের সৃষ্টি করে।

গর্ভাবস্থায় এ সব উপসর্গের উপাগম অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং গর্ভবতী মায়েদের এ জন্য লজ্জিত হওয়ার কোনোই কারণ নেই।

কোষ্ঠকাঠিন্য স্বভাবতই শারীরিকভাবে অস্বস্তিকর, মলত্যাগ সময় বহুল, মল শক্ত এবং ছোট আকারের হয়, পেটে চাপ বা কোঁত দিতে হয়, মলত্যাগে স্বস্তি হয় না এবং মলত্যাগ প্রক্রিয়া অনেক সময়ই ক্লান্তিকর অনুভূত হয়। এ ছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য তলপেট ও নিচের পিঠে ব্যথা, পেট ফাঁপা, বমিবমি ভাবের উদ্রেক করা ইত্যাদি একক অথবা একসাথে একাধিক উপসর্গ প্রদর্শন করতে পারে। একাধিক উপসর্গ একসাথে প্রদর্শন কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবলতার ওপর নির্ভরশীল।

গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য এতই স্বাভাবিক যে, অন্যান্য লক্ষণের সাথে সাথে কোষ্ঠকাঠিন্যতাকেও গর্ভধারণের একটি লক্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

গর্ভকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ের জন্য বেশ কয়েকটি কার্যকরী চিকিৎসা আছে। এ ছাড়াও প্রতিকারের পাশাপাশি পরিপাকতন্ত্রের উপসর্গ পরিহার করতে সব সময়ই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ এবং সহজে অনুকরণযোগ্য জীবনপদ্ধতি পরিবর্তনের উপদেশ দিয়ে থাকি। এই উপদেশসমূহ গর্ভকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে ত্রাণ পেতে সাহায্য করে।

আমার উপদেশগুলো :
১। প্রচুর পানি পান করা।
২। ফাইবারসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, যেমন ফাইবারযুক্ত বাদামি পাউরুটি, ফল, শাকসবজি, ডাল ও মটরশুঁটি।
৩। একবারে অনেক খাবার এক সাথে খাওয়ার পরিবর্তে অল্প করে সারা দিনে বেশ কয়েকবার খাওয়া অভ্যাস করা, যা পরিপাকতন্ত্রের ওপর হতে চাপ বা ধকল কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।
৪। মনে রাখতে হবে, ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেলে খাবারের সাথে সারা দিনে পানি পানের পরিমাণও বাড়িয়ে দিতে হবে।

জীবন প্রণালী পরিবর্তনে উপদেশ
১। অল্প করে কিন্তু নিয়ম করে প্রত্যেহ হালকা ব্যায়াম করা।
২। পিঠের নিম্নদেশে উপর থেকে নিচে মর্দন করা।
৩। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অথবা খাবার খাওয়ার পরপরই নিয়ম করে মলত্যাগের চেষ্টা করা। মলত্যাগের অনুভূতি এলে দেরি না করে মলত্যাগ করা।

গর্ভকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ের জন্য কার্যকরী চিকিৎসা :
১। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করার পরেও যদি কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় না হয় তাহলে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। অবশ্য মনে রাখতে হবে যেকোনো ওষুধ মায়ের শরীরে প্রবেশ করলে ভ্রূণ/পেটের বাচ্চার ওপর তার প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আর তাই বিশেষজ্ঞের উপদেশ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো এখন ধাত্রীবিদ্যায় শিক্ষিত মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে এবং মিডওয়াইফ দ্বারা গর্ভকালীন মায়েদের সেবার অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে।

২। কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ের জন্য যে সব ওষুধ পরিপাকতন্ত্রে থেকে যায় কিন্তু রক্তে প্রবেশ করে না যেমন ল্যাক্টুলোজ, গর্ভকালীন মায়েদের ব্যবহারযোগ্য কিন্তু নেশা জাতীয় ওষুধ নয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের ফলে পেটে ব্যথা হলে সবচেয়ে কম পরিমাত্রায় প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে স্বল্প সময়ের জন্য। কোষ্ঠকাঠিন্য যদি আরো জটিলতার সৃষ্টি করে তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
এরপরের সংখ্যায় গর্ভকালীন মায়েদের পাইলস সম্পর্কে আলোচনার ইচ্ছা রাখি।

গর্ভকালীন মায়েদের পাইলস্ বা হিমোরয়েডস্
পাইলস্ বা হিমোরয়েডস্ পায়ুপথ ও মলাশয়ের শেষ অংশে অবস্থিত গদি বা বালিশের ন্যায় রক্তনালীসমৃদ্ধ স্ফীত অংশ, যা পায়ুপথ দিয়ে মল নির্গমন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যদিও সব মানুষের স্বাভাবিক দেহের অংশ, শুধুমাত্র উপসর্গ দেখা দিলেই ওই স্ফীত রক্তনালীসমৃদ্ধ অংশগুলোকে পাইলস্ বা হিমোরয়েডস্ বলা হয়ে থাকে। যদিও পাইলস্ এর উপসর্গ যেকোনো মানুষের হওয়া সম্ভব গর্ভকালীন মায়েদের গর্ভকালীন হরমনের প্রভাবে পাইলস্ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়, অনেক ক্ষেত্রেই পায়ুপথের বাইরে বেরিয়ে আসে এবং জটিলতার সম্ভাবনা বহুলাংশে বেড়ে যায়।
পাইলসের যেসব উপসর্গ লক্ষণীয়

পায়ুপথে রক্ত যাওয়া সাধারণত টকটকে লাল, চুলকানি, বেদনা, জ্বালা অথবা পায়ুপথের চারধারে ফোলা, মলত্যাগের সময়ে পায়ুপথে ব্যথা অনুভব করা এবং মলত্যাগের পর শ্লেষা নির্গমন, এক বা একাধিক পাইলস পায়ুপথের বাইরে বেরিয়ে আসা যেগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে মলত্যাগের পর পায়ুপথের মধ্যে ফিরে যায় অথবা চাপ দিয়ে ভেতরে পৌঁছে দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাইলসগুলো সব সময় বাইরেই অবস্থান করে।
কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের উপসর্গ সৃষ্টি করে ও বৃদ্ধি করে এবং তাই কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের সাথে থাকলে তার চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার পূর্বে অথবা পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের উপসর্গ পরিহার করতে সব সময়ই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ এবং সহজে অনুকরণযোগ্য জীবনপদ্ধতি পরিবর্তনের উপদেশ দিয়ে থাকি। এই উপদেশগুলো গর্ভকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পাইলস থেকে ত্রাণ পেতে সাহায্য করে। এই উপদেশসমূহ আমি পূর্বেই কোষ্ঠকাঠিন্য সম্পর্কে আলোচনার সময় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছি।

গর্ভকালীন সময়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা অথবা টয়লেটে বেশি সময় বসে থাকা সমীচীন নয়। অনেক সময় কাপড় বরফযুক্ত পানিতে ভিজিয়ে খুব হালকাভাবে পাইলসে চেপে রাখলে আরাম পাওয়া যেতে পারে। পাইলস বেরিয়ে এলে সাবধানতার সাথে পিচ্ছিল লুবরিকেন্ট জেলি দিয়ে ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করতে হবে। মলত্যাগের সময় অযথা চাপ বা কোঁত দেয়া পরিহার করতে হবে। মলত্যাগের পর শুষ্ক কাগজের পরিবর্তে ভেজা কাগজ দিয়ে হালকা ছোঁয়ার মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে। পাইলস ফুলে বা বেরিয়ে থাকলে ওমা গরম পানিতে পাইলস ডুবিয়ে বসলে অনেক সময় আরাম লাগতে পারে। উপসর্গ বেশি হলে ডাক্তার বা মিডওয়াইফের সাথে পরামর্শ করে প্রদাহনাশক ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে পারা যাবে। ডাক্তার বা মিডওয়াইফের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করা উচিত হবে না। জীবন সঙ্কটময় জটিলতা না হলে গর্ভকালীন সময় সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা পরিহার করা হয়। কারণ বাচ্চার জন্মের পরে সাধারণত পাইলস উপসর্গের উন্নতি হয়। বাচ্চা জন্মের পর যাদের গর্ভাবস্থায় পাইলস ছিল তাদের ডাক্তারের অথবা মিডওয়াইফের কাছে পুনঃপরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য