মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে জঙ্গি গোষ্ঠি ইসলামিক স্টেট-

আইসের কোণঠাসা অবস্থার মধ্যে শামিমার ঠাঁই হয়েছিল সিরিয়ার একটি আশ্রয় শিবিরে। গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ দৈনিক টাইমসের এক সাংবাদিক তাকে সেখানে খুঁজে পেয়েছিলেন। সে সময় সন্তানসম্ভাবা শামিমা জানিয়েছিলেন, অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তিনি ফিরতে চান লন্ডনে, পরিবারের কাছে।

কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার নাগরিকত্ব বাতিল করায় নিঃসঙ্গ শামিমা এখনও আশ্রয় শিবিরেই রয়ে গেছেন। বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণী জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে ফেরার অনুমতি না পাওয়ার কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

চলতি সপ্তাহে ডেইলি মেইলের সাংবাদিক রিচার্ড পেন্ডলবুরির সঙ্গে যখন কথা হয় শামিমার।

মুখে নেকাববিহীন শুধু লিপ গ্লস আর নাকফুল পরা শামিমা বলেন, “আমার কোনো সত্যিকারের বন্ধু নেই। যারা আমার সাথে (সিরিয়ায়) এসেছিল তাদের সবাইকে আমি হারিয়েছি। এখন কেউ নেই।”

আশ্রয় শিবিরে কেমন কাটছে দিন? শামিমা বলেন, “শারীরিকভাবে ঠিক থাকলেও আমার মানসিক অবস্থা ভালো না। আমি এখনও তরুণ, খুব একটা অসুস্থও হই না। সমস্যা এটা না। তবে মানসিকভাবে আমি আসলেই খারাপ অবস্থায় আছি। দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে আমার থেরাপি দরকার। এটা খুবই কঠিন। আমি আমার সব সন্তানকে হারিয়েছি।”

সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটিতে গিয়ে ধর্মান্তরিত এক ডাচকে বিয়ে করেছিলেন শামীমা। আশ্রয় শিবিরে যখন তার প্রথম খোঁজ মেলে, তখন ছিলেন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরে শামিমা এক ছেলে সন্তানের (জারাহ) জন্ম দিলেও দুই সপ্তাহ বয়সে শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর আগে আরও দুটি সন্তানের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিলেন শামিমা।

“এখানে আমি যাদের সঙ্গে থাকি, তারা কেউই আমার অভিজ্ঞতার কথা জানে না। তারা আমার স্কুলের বন্ধুদের মতো নয়, যাদের সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি। আমি যে কিসের মধ্যে আছি তারা বুঝতেও পারবে না,” এভাবেই নিজের বর্তমান অবস্থার চিত্র তুলে ধরেন শামিমা।

কিছু আশ্রয় শিবিরে মনোঃচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও শামিমা যেখানে থাকেন সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানান।

শামিমা এর আগে জানিয়েছিলেন, সিরিয়ায় আইসে যোগ দেওয়ার পর প্রথম মানুষের ছিন্নমস্তক দেখে তার কোনো ভাবান্তর ছিল না। কিন্তু এখন ঠিক উল্টো অবস্থা তার। আইএসের কর্মকাণ্ড, নীতি-আদর্শ- সবকিছুকে এখন ঘৃণা করেন। অতীতে তিনি যা কিছু করেছেন, তা সন্তানদের সুরক্ষার জন্যই করেছেন বলে দাবি করেন শামিমা।

আইএসে তার প্রথম আট মাস শুধু স্বামীর কারাগার থেকে ফেরার অপেক্ষাতেই কেটে গেছে বলে জানান তিনি। এরপর থেকে একের পর এক সন্তান ধারণ করতে হয়ে তাকে।

সানশাইন আশ্রয় শিবিরে আসার পর শামিমা বেশকিছু সিনেমা দেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘মেন ইন ব্ল্যাক: ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ‘স্পাইডারম্যান: ফার ফ্রম হোম’। তবে নিজের ঘর থেকে দূর প্রবাসে পশ্চিমা সঙ্গীতের অভাবটাই বেশি অনুভূত হয় তার।

বন্ধু-বান্ধব তো দূরের কথা, যুক্তরাজ্য থেকে এমনকি তার পরিবারের কেউই তার সঙ্গে যোগাযোগ করে না বলে জানান শামিমা। তিনি কথা বলতে চাইলেও কেউ আগ্রহ দেখায় না।

“আমার একটিই অপরাধ- সিরিয়ায় আসা। আমি আমার ঘরে থাকতে চাই। ব্রিটিশ জেলও অনেক বেশি নিরাপদ। সেখানে শিক্ষা এবং পরিবার আছে। এখানে (সিরিয়া) কি হবে তা নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা, এটা এখনও যুদ্ধক্ষেত্র। আমি চাই দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আমার বিচার করা হোক। আশ্রয় শিবিরে থাকাটাই তো একটা শাস্তি।”

ব্রিটিশ সরকারের কাছে শামিমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত বদলানোর দাবি জানিয়েছেন তার আইনজীবী মোহাম্মদ আকুনজি। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হচ্ছে, চরমপন্থার সঙ্গে তার মক্কেলের পরিচয় এবং সেভাবে নিজেকে টড়ে তোলা, সবকিছু হয়েছে যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলায় দাবি করলেও, বাংলাদেশের সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই।

কারও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেই কেবল একটি বাতিল করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্য শামিমার নাগরিকত্ব বাতিলের পর প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চাইবেন। কিন্তু বাংলাদেশও সেটি দিতে অস্বীকার করেছে।

এর আগে এ বছরই ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লেখা এক চিঠিতে আইনজীবী আকুনজি বলেছিলেন, “তারা (বাংলাদেশ) তাকে নিতে চায়নি। তিনি কখনো ওই দেশে যানওনি। যেহেতু শামিমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, চরমপন্থার সঙ্গে পরিচয় এবং জড়িয়ে পড়া সবই হয়েছে যুক্তরাজ্যে, সেখানে শামিমাকে বাংলাদেশি নাগরিক বলাটা ধোপে টেকে না। ব্রিটেনের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরই।

“শামিমা এবং তার ছেলের দায়িত্ব না নিয়ে এটিকে ব্রিটেনের একটি সমস্যা হিসেবে নিয়েছেন এবং বিষয়টি আমাদের একজন নিরাপরাধ অভিবাসী নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অসম্মানজনকভাবে শামিমার আর্থিক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব কুর্দিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনারা তার অসুস্থ সন্তানের পরিচর্যা এবং মৃত্যুর পর তাকে কবর দেওয়ার কাজটুকু করেননি। বরং চতুরতার সাথে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাকে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আপনাদের এই হতাশানজক সিদ্ধান্ত আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হওয়া মানুষের সংখ্যাই শুধু বাড়াবে।”

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এর আগে বলেছিলেন, শামিমাকে বাংলাদেশে পাঠানো হলে সন্ত্রাসবাদে জড়ানোর কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।

শামিমার ‘জিহাদী’ স্বামী ইয়াগো রেইদিকও চেয়েছিলেন, স্ত্রী-সন্তান ইউরোপে স্বাভাবিক জীবেন ফিরে যাবে। ছয় বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ডাচ নাগরিক রেইদিক এখন আছেন কুর্দিনিয়ন্ত্রিত একটি বন্দিশিবিরে। স্বামীর দেশ নেদারল্যান্ডসও শামিমাকে নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য