আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাটঃ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহলসমূহে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের হিড়িক পড়েছে। সহজে চাকুরি সরকারি করার নামে চলছে মোটা অংকের টাকার বাণিজ্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্কুলের ফাইল চুরান্ত। যে কোনো সময় চাকুরি সরকারির ঘোষণা হবে- স্কুল সমূহে জোর প্রচার চালিয়ে একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ।কোনোকিছু বললে বা টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন হুমকি প্রদানসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখায় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে।

উপজেলার ১নং শ্রীরামপুর ইউনিয়নের বিলুপ্ত ২৩ নং খাসবাস দ্বারিকামারী ছিটমহল এলাকায় ২০১৮ সালের মে মাসে পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী পরিদর্শক মোসলেম উদ্দিন ‘কুমুর উদ্দিন মাছিরনবাড়ী নামে বেসরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন।বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ওই এলাকার চার কন্যা সন্তানের জনক জবেদ আলীর একজন মেয়েকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিবেন জানিয়ে ৩৩ শতক জমি স্কুলের নামে স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করে নেন এবং ২০১১ সালের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও ফাইল তৈরি বাবদ দুই লক্ষ টাকাও মোসলেম উদ্দিন।

এর কিছুদিন পর অন্যপ্রার্থী ঠিক করে জবেদ আলীর মেয়ের নাম শিক্ষকের তালিকা থেকে বাদ দেন। একপর্যায়ে বিদ্যালয় স্থাপনের জমি ছেড়ে দিলেও নগদ নেয়া দুই লক্ষ টাকা ফেরত দেননি মোসলেম উদ্দিন। টাকা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে জবেদ আলী ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন।

উপজেলার বিভিন্ন বিলুপ্ত ছিটমহল সমূহ ঘুরে দেখা গেছে, ৮ নং ভোটবাড়ী আজিজুল নগর, ১৪ নং মৌলভী খিদির বকস, ১৪ নং লতামারী তরিমল, ২১ নং পানিশালা ছলেমান কবিরন নগর, ২৩ নং খাসবাস দ্বারিকামারী কুমুর উদ্দিন মছিরন বাড়ী, ১১৯ নং বাঁশকাটা, ১৩২ নং বাঁশকাটা তাতিপাড়া বঙ্গবন্ধু, ফুলজান রহিম উদ্দিনটারী, আলিম জামুর বাড়ী ও বিমলা গোপালবাড়ী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে ২০১১ ও ২০১২ সালে সাইড বোর্ড টানিয়ে এসব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দেখানো হয়েছে।

বিদ্যালয় সন্নিকট এলাকাবাসি জানায়, উল্লেখিত বিদ্যালয় গুলো ২/১ বছর আগে গড়ে তোলা ও আশে পাশে একাধিক চলমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিদ্যমান। বিলুপ্ত ছিটমহলে সরকারের ১৫০০ বিদ্যালয়বিহীন স্কুল প্রকল্পের নির্মিত চারটি ভবনও দখলে নেয়া হয়েছে। দু’একটিতে ৮/১০ জন ছেলে- মেয়ে দেখা গেলেও অন্যান্য নামমাত্র বিদ্যালয় সমূহে কোনো ছাত্র/ ছাত্রী নাই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘বাঁশকাটা বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিব্য নাথের নের্তৃত্বে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করে বিদ্যালয় গুলো সরকারি করণের কাজ চলছে।’

এ ব্যাপারে দিব্য নাথ বলেন, ‘আমি বিলুপ্ত ছিটমহলে স্থাপিত দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করছি এবং স্কুল গুলোর নেতৃত্ব দেই।’

পুরাতন ফাইল তৈরি, জ্বাল কাগজপত্র, ব্যাক ডেটে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, মিথ্যা প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখিয়ে উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে। বিভিন্নভাবে প্রতারিত হচ্ছে বেকার চাকুরি প্রত্যাশীরা।

এ ব্যাপারে মোসলেম উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ জবেদ আলী বলেন, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের সর্বস্বান্ত করার হাত থেকে রক্ষা ও টাকা উদ্ধারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

পাটগ্রাম প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলে স্থাপিত বিদ্যালয় গুলোর কোনো তথ্য আমাদের এখানে নেই। এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) ভালো বলতে পারবেন।’

লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) মো. গোলাম নবী বলেন, ‘এভাবে বিদ্যালয় স্থাপন প্রতারণা করা ও ভবন দখল সম্পূর্ণ বেআইনি। আমি নতুন যোগদান করেছি অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য