দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দেশের একমাত্র পাথর খনি হতে শিলা উৎপাদনে জার্মেনিয়া ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়াম নামে একটি কোম্পানীর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ তারিখ হতে জিটিসি ইতঃপূর্বে নির্মিত ৫টি স্টোপ হতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। ঠিকাদার ইতোমধ্যে ০৬ টি নতুন স্টোপ উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ করেছে। সেখান হতে প্রতিদিন ৩ শিফটে ৪০০০ মে: টন শিলা উত্তোলন করছে। চুক্তির পর হতে এ পর্যন্ত জিটিসি প্রায় ৩০ লক্ষ টন শিলা উৎপাদন করেছে।

গত ৩-এপ্রিল ১৯ রাত সাড়ে ৯ ঘটিকায় স্কিপ ওয়াইন্ডিং ক্রীপ মটরের পিনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় মধ্যপাড়া পাথর খনি।

সরকারের রেলমন্ত্রী মোঃ নুরুল ইসলাম সুজন আজ শনিবার সকালে দেশের একমাত্র ভুগর্ভস্থ খনি মধ্যপাড়া পাথর খনি পরিদর্শন করেন। খনি পরিদর্শরকালে তিনি দেশীয় সম্পদ ব্যবহারে সর্বচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বাংলাদেশ রেলওয়েকে তাদের চাহিদাপূরনে সর্বপ্রথম মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করেন। খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানান যে, ইতোঃপূর্বে এ পর্যস্ত খনির উৎপাদিত মোট ১২ লক্ষ মেট্রিক টন ব্যালাস্ট বিক্রয় করা হয়েছে।

এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিকট সরাসরি প্রায় ২ লক্ষ মেট্রিক টন এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে আরো প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন ব্যালাস্ট বিক্রয় করা হয়েছে। মধ্যপাড়া খনির উৎপাদিত ব্যালাস্ট পাথর রেলওয়ের পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রেললাইন প্রকল্পে ,নাটোর-ঈশ্বরদী-পাবনা-সিরাজগঞ্জ-বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় রেললাইন, মধুখালি-ফরিদপুর-রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া রেললাইন প্রকল্প,কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা-রেললাইন প্রকল্প, ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া-যশোর-খুলনা-রেললাইন সংস্কার প্রকল্প, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর-রেললাইন সংস্কার প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়াও রেলওয়ের বিভিন্ন সংস্কার কাজে মধ্যপাড়া খনির ব্যালাস্ট পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। কোম্পানীর প্রধান অফিসে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন রেল সচিব, রেলওয়ের ডিজিসহ রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

কোরীয় বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহায়তার প্রতিদিন এক শিফটে ৬০০-৮০০ মেট্রিক টন উৎপাদন হত। খনি থেকে প্রতিদিন তিন শিফটে ৫,৫০০ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন এবং নতুন স্টোপ উন্নয়ন এর জন্য মাইন ম্যানেজমেণ্ট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। জার্মানীয়া-ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এর মধ্যে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে ৬ বৎসরের জন্য বৈদেশিক ও স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা মূল্যমানের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মতে ঠিকাদার ১২টি নতুন স্টোপ উন্নয়ন ও ৯২ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করবে।

বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) কর্তৃক ১৯৭৪ সালে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকায় ভূ-গর্ভের ১২৮-১৩৬ মিঃ গভীরতায় গ্রানাইট পাথর আবিস্কৃত হয়। ১৯৭৬-৭৭ সালে কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়ায় একটি ভূ-গর্ভস্থ খনি বাস্তবায়ন কারিগরি ও অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক বলে সুপারিশ করে। ১৯৮৮-৮৯ সালে নিপ্পন কোই জাপান কর্তৃক পাথরের বাজার সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এবং উত্তর কোরীয় সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক, কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং উত্তর কোরীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স কোরীয়া সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন কর্পোরেশন (নামনাম) এর মধ্যে ২৭ মার্চ ১৯৯৪ তারিখে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট এর আওতায় একটি টার্ণ কী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স নামনাম সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সাল হতে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। উত্তর কোরীয় ঠিকাদার ২৫ মে ২০০৭ সালে খনিটি মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড(এমজিএমসিএল)-এর নিকট হস্তান্তর করে।

কঠিন শিলা খনির পাথর হতে উন্নতমানের গ্রানাইট স্লাব তৈরীর পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ফজলুর রহমান জানান যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রানাইট স্লাব তৈরী করার সম্ভাবতা যাচাইয়ের জন্য পেট্রোবাংলার অর্থায়নে ফিজিবিলিটি ষ্টাডি কাজ শেষ হয়েছে। ষ্টাডি রিপোর্ট পাওয়ার পরে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

মধ্যপাড়া খানি হতে শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ লক্ষ টন শিলা উত্তোলন করা হয়েছে। যার বিপরীতে প্রায় ৩৬ লক্ষ টন শিলা বিক্রয় করা হয়েছে। মধ্যপাড়া কঠিন শিলা অতি উন্নতমানের হওয়ায় দিনদিন এর চাহিদা বাড়ছে। ব্যুারো অফ রিসার্চ এন্ড টেস্টিং কনসালটেশন (বিআরটিসি), বুয়েট এর বিভিন্ন টেষ্ট হতে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী এ’শিলার ফিজিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোপার্টিজ নির্মাণ কাজের জন্য কন্সট্রাক্শন ম্যাটরিয়াল হিসেবে যথেষ্ট মজবুত, টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব। এছাড়া ইংল- এবং সিংগাপুর থেকে রাসায়নিক পরীক্ষায় মধ্যপাড়ার পাথর ক্ষতিকারক প্রমানিত না হওয়ায় এটা সকল প্রকার নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা যায়।মধ্যপাড়া পাথর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যু কেন্দ্র, ৬ লেন প্রকল্প, যমুনা নদী রক্ষা প্রকল্প রেলওয়ে নির্মান কাজসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। খনি হতে উৎপন্ন স্টোন ডাস্ট সিমেন্ট, বিভিন্ন ডেকোরটিভ টাইলস, সি সি ব্লক, লন পেভমেন্ট ইত্যাদি তৈরীর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

উন্নতমানের পাশাপাশি মধ্যপাড়া কঠিন শিলার মূল্য সাশ্রয়ী হওয়ায় এবং লোডিং ও ওজন আধুনিক হওয়ায় ক্রেতারা ব্যাপকভাবে এ শিলা ব্যবহার করছে। যেখানে পাশর্^বর্তী ভারত হতে আমদানীকৃত ৩/৪ সাইজের পাকুর পাথরের মূল্য টন প্রতি ৩০০০ টাকা এবং সেখানে মধ্যপাড়া কঠিন শিলার মূল্য টন প্রতি ২৭০০ টাকা। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প যেমন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট, পাওয়ার প্লান্টসমূহ, বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্প (বাঁশখালী ও রামপাল, মহেশখালী-মাতারবাড়ী), ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পাতাল রেল, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য টানেল, কক্সবাজার বিমান বন্দর নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং রেল লাইন নির্মান ও রেলওয়ের বিভিন্ননির্মাণ প্রকল্পে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ পাথরের প্রয়োজন হবে। এসকল প্রকল্পে গুণগতমানে উৎকৃষ্ট মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য