পরিমিত শর্করা এবং সুষম খাবার গ্রহণ করুন

শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত, রুটি, আলু, পাস্তা, নুডুলস, ওটস বা অতিরিক্ত মিষ্টি ফল প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবেন না। আবার, সুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য ভুলেও শর্করা জাতীয় খাবার খাদ্যতালিকা থেকে একেবারে বাদ দিবেন না।

প্রত্যেক বড় মিলে অর্থাৎ ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারে ৩০-৪৫ গ্রাম শর্করা থাকলেই যথেষ্ট, বাকিটাতে থাকবে মাছ, মাংস বা ডিম অথবা ডাল, সঙ্গে থাকবে শাক এবং সবজি।

প্রতি ৩০ গ্রামের ১ পিস রুটি, ৬০ গ্রাম বা ১/২ কাপ ভাত অথবা ৩০ গ্রাম ওটস থেকে পাবেন ১৫ গ্রাম শর্করা। তবে আপনার জন্য কয়টি রুটি বা কতটুকু ভাত বা ওটস লাগবে তা নির্ভর করবে আপনার ওজন, উচ্চতা, বয়স, আপনার সারাদিনের কাজের ধরন বা কোনো ধরনের অপুষ্টি আছে কি না প্রভৃতি বিষয়ের উপর।

সময়মতো প্রতিবেলার খাবার গ্রহণ

যেকোনো ধরনের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, সময়মতো খাবার গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। তেমনিভাবে, প্রতিদিন একই সময়ে খাবার গ্রহণ করলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়।

সুতরাং, আপনি যত ব্যস্তই থাকুন না কেন, খাবার গ্রহণের সময় বের করে নিন। মনে রাখবেন সকালের নাস্তা ৭ – ৯টার মধ্যে, দুপুরের খাবার ১ – ৩টার মধ্যে এবং রাতের খাবার অবশ্যই ৮টার মধ্যে নেয়ার চেষ্টা করবেন। এছাড়া মর্নিং, ইভিনিং এবং লেট নাইট স্নাক্স নিতে ভুলবেন না।

প্রতিবেলার খাবারের সঙ্গে আমিষ গ্রহণ করুন

গর্ভকালীন সময়ে এমনিতেই প্রোটিন চাহিদা বেড়ে যায়। আর প্রতিটি বড় মিলের সঙ্গে প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, দুধ রাখলে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ। সুতরাং, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল রাখুন।

ছোট ছোট মিল গ্রহণ করুন

একবারে অনেক পরিমাণ খাবার না খেয়ে, সারাদিনের খাবারকে ৬-৭ বারে গ্রহণ করুন। ৩টা বড় মিলের পাশাপাশি প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর অল্প অল্প করে স্বাস্থ্যসম্মত যেকোনো খাবার খান। ছোট মিলগুলোয় ১টা মাঝারি ফল, ১ কাপ দুধ, ১০-১৫ গ্রাম বাদাম, ১/২ কাপ টক দই বা ১ কাপ মিক্স ফল খেতে পারেন। তবে এক জিনিস বারে বারে খাবেন না।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন

অনেকেই ভাবেন, গর্ভধারণ করলে ব্যায়াম বা অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। একারণে, অনেকটা শুয়ে বসে কাটিয়ে দেন পুরো গর্ভকালীন সময়টা। মনে রাখবেন যদি গর্ভকালীন সময়ে বিশেষ কোনো জটিলতা দেখা না দেয়, তবে আপনি সব ধরনের স্বাভাবিক কাজকর্ম বা ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারবেন।

তবে কোনো ধরনের ভারী কাজ করবেন না এবং ব্যায়ামের পূর্বে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

নিয়মিত স্বাভাবিক শারীরিক পরিশ্রম, স্বাভাবিক কাজকর্ম বা ব্যায়াম করলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা দুটোই বৃদ্ধি পায়।

রাতে খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ রুমের মধ্যে পায়চারী করুন

অনেকেরই রাতে খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ার অভ্যাস আছে, তাদেরকে বলছি- রাতে খাবার খাওয়ার পর কিছুক্ষণ সারা ঘরে পায়চারী করুন।

মনে রাখবেন, রাতের খাওয়া এবং ঘুমোতে যাওয়ার ব্যবধান অন্তত ২ ঘণ্টা হওয়া উচিত। এতে করে ইনসুলিন ভালোভাবে কাজ করতে পারে, ফলে ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে থাকে। যদিও গর্ভকালীন সময়ে, সব দিন একইভাবে যাবে না তাই রাতের খাবার ৮টার মধ্যে খেয়ে নিন।

প্রসেসড ফুড, তৈলাক্ত এবং মিষ্টি জাতীয় খাবারকে পুরোপুরি না বলুন

বর্তমানে, আমরা বাইরের নানারকম মুখরোচক খাবার খেয়ে অভ্যস্ত এবং গর্ভধারণ করার পরও অনেকে বাইরের খাবার খাওয়ার অভ্যাস ছাড়তে পারেন না।

এই সব খাবার প্রসেসিং করার সময় এর সঙ্গে চিনি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হয় যা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সমস্যা সৃষ্টি করে। আর রান্নায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করবেন না।

নিয়মিত ফল গ্রহণ করুন

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে অনেকেই ভাবেন যে ফল খাওয়া যাবে না, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আপনার দৈনিক খাদ্য তালিকায়- পেয়ারা, আপেল, আমলকী, বাতাবি লেবু, আমড়া প্রভৃতি ফল রাখুন। তবে সুগার নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে অতিরিক্ত পাকা ফল বেশি পরিমানে গ্রহণ করা উচিত নয়। কলা, কাঁঠাল, আতা- এই ধরনের ফলগুলো দিনের বেলায় সীমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।

নিয়মিত ব্লাড গ্লুকোজ চেক এবং মনিটর করুন

আপনার খাওয়ার ধরন ঠিক আছে কি না এবং অন্যান্য জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে- নিয়মিত ব্লাড সুগার চেক করা।

আপনার সুগার লেভেল কত আছে- এর উপর নির্ভর করবে আপনার ইনসুলিনের ডোজ। সুগার বেশি থাকলে ইনসুলিনের ডোজ বাড়াতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে আপনার খাদ্যাভ্যাসের ধরন।

মূলত, খাবার গ্রহণের ধরন এবং সময় যদি ঠিক না থাকে তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা জটিল হয়ে পড়ে। তাই সময়মতো সুষম খাবার গ্রহণ করুন।

আর একটি বিষয়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মেডিসিনের চেয়ে ইনসুলিন নিরাপদ। তাই ইনসুলিন নিয়ে অযথা ভয় করবেন না। আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলুন।

সাধারণত, অপুষ্টি, গর্ভবতী মায়ের ওজন বেশি, অলস জীবনযাপন, ত্রিশ বছরের বেশি বয়সে গর্ভধারণ, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, হরমোন প্রভৃতি কারণে একজন গর্ভবতী মা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।

তবে কারণ যাই হোক না কেন গর্ভকালীন জটিলতা এড়াতে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন হোন এবং সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য