সবুজের সমারোহে ছেয়ে গেছে পঞ্চগড়ের উচু নিচু মাঠ ঘাট। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনাও পরিনত হয়েছে চা বাগানে। তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের পেদিয়াগছ গ্রামটি পরিনত হয়েছে চায়ের বাগানে।পেদিয়াগছ গ্রামে ঢুকলে চায়ের গন্ধে মন ভরে যায়। যেখানে ছিল ধুধু বালু চড়। কোন ফসল ফলাতে পারত না সে এলাকার মানুষ। মাঝে মধ্যে দেখাযেত আখ চাষের।

এক সময় আখ চাষ করে অনেকে সর্ব শান্তও হয়েছে। গত ২০০০ সালে রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের সহযোগীতায় ও তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী লিঃ এর পরামর্শক্রমে পরীক্ষামুলকভাবে শুরু করে চা চাষ। চা চাষে লাভবান হওয়ায় আস্তে-আস্তে বাড়তে থাকে চা চাষ। পরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উচু জমিতে বাড়তে থাকে চা চাষের ব্যপকতা।

এ সময় পঞ্চগড় জেলায় একটি মাত্র টিটিসিএল নামে একটি চা কারখানা স্থাপন করে মোশারফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তার কারখানায় জন গনের মাঝে চা চায়ে উৎসাহিত করায় বাড়তে থাকে চা চাষ। বর্তমানে চা চাষে চাষীদের মাঝে এত আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ১৩ টি কারখানা স্থাপন করে চা মাড়াই কাজ চলছে। এতে চায়ের চাহিদা কারখানা মালিকদের কাছে বেশী হয়ে দাড়িয়েছে। কারখানা মালিকদের বিভিন্ন অজুহাতের কারনে এখন হতাশ হয়ে পড়েছে চা চাষীরা।

কাঁচা চা পাতার দাম কমে যাওয়ায় হতাশায় পড়েছে তেঁতুলিয়ার ক্ষুদ্র চা চাষিরা। তাদের অভিযোগ কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাঁচা চা পাতার দর কমিয়েছেন। অন্যদিকে কারখানা মালিকরা বলছেন ক্ষুদ্র চাষিরা কাঁচাপাতা তুলতে নিয়ম মানছেনা বলে চায়ের মান খারাপ হওয়ায় দাম কমে গেছে । তাই নিলাম বাজারে তৈরী চায়ের মূল্য কমে যাবার কারণে এখানে কমেছে কাচা চা পাতার দামও। কাঁচা চা পাতার মূল্য বাড়ানোর জন্য চাষিদেরকে নিয়ম মেনে কাঁচা পাতা সংগ্রহ ও ভালো চারা রোপনের পরামর্শ দিচ্ছে চা বোর্ড।

২০১৮ সালে প্রতি কেজি কাঁচা পাতার মূল্য ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। কিন্তু এ বছর হঠাৎ করেই মূল্য কমে যায় অর্ধেকেরও নিচে। বর্তমানে জেলায় ১৩ টি চা কারখানার কর্তৃপক্ষ প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য দিচ্ছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকা। ফলে বিপাকে পড়েছেন জেলার প্রায় ৫ হাজার চা চাষি । তারা বলছেন এই মূল্যে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। চা শ্রমিকদের মুজুরী এবং সার কীটনাশকের মূল্য পরিশোধ করতে ঘর থেকে টাকা দিতে হয়। অনেকে আবার গাছ থেকে কাঁচা চা পাতা কেটে ফেলে দিচ্ছেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের সাহেবের হাট এলাকার চা চাষি তাকে জানান কারখানার মালিকেরা সিন্ডিকেট করে কাঁচা চা পাতার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। দাম কম দেয়ার পাশাপাশি কেজীতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কাঁচা চা পাতার মূল্য পরিশোধও করেননা। প্রতিবাদ করলে চা পাতা কেনা বন্ধ করে দেন তারা।

এসব কারণে পঞ্চগড়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন নতুন চাষিরা। ফলে বিক্রী হচ্ছেনা চায়ের চারা। লোকশান গুনতে হচ্ছে চারা উৎপাদনকারী চাষিদেরও।

মঞ্জুর আলম, ব্যবস্থাপক, গ্রীণ কেয়ার এগ্রো লি ঃ বলছেন ক্ষুদ্র চা চাষিরা গাছ থেকে চা পাতা সংগ্রহে নিয়ম মানছেন না। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে চা পাতা প্লাকিং করার কথা থাকলেও তারা চল্লিশদিন পর পর চা পাতা তোলেন । প্রতিটি গাছ থেকে নতুন আড়াই থেকে তিন পাতা দেয়ার কথা থাকলেও তারা ৫ থেকে ১০ পাতা সরবরাহ করছেন। ফলে চায়ের মান কমে গেছে। এ কারণে অকসন মার্কেটে তৈরী চায়ের দর পতন ঘটেছে। ফলে কাঁচা চা পাতার মূল্য পাচ্ছেননা চাষিরা। এ ছাড়া অতিরিক্ত মুজুরী এবং সার কিটনাশক ব্যবহারের কারণে লোকশান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন, উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ চা বোর্ড, পঞ্চগড় গত ১৪ জুলাই পঞ্চগড় জেলার কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারন কমিটি প্রতি কেজী কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারন করে ১৬ টা ৮০ পয়সা। ৪ থেকে ৫ পাতার চা পাতা সরবরাহের জন্য নির্দেশ দেয়া হয় চাষিদের। বর্তমানে এসব নিয়ম মেনে চাষিেেদর কাঁচা চা পাতা সরবরাহের পরামর্শ দিচ্ছেন বাংলাদেশ টিবোড।

পঞ্চগড়ে চা চাষ শুরু হয় ২০০০ সালে। শুরুতে বড় বাগান হলেও পরে ক্ষুদ্র চাষিরাও চায়ের আবাদ শুরু করে। ২০১৮ সালে এই জেলায় ৩ কোটি ৭৭ লক্ষ ২১ হাজার ৭’শ ৪ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ৭৮ লক্ষ ২২ হাজার ৮৮ কেজি তৈরী চা পাতা উৎপন্ন হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য