বিরল (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ ২০১৭ সালের ১২ আগষ্ট। নদীর বাঁধ ভেঙ্গে ভয়াবহ বন্যায় দিনাজপুরে ১৩টি উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যায় এই জেলায় নিহত হয় ২৯ জন আর আহত হয় শতাধিক। ভয়াবহ ওই বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭১টি পরিবারের ৬ লাখ ২১ হাজার মানুষ। বন্যার ফলে ২৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর ১৫০ কিলোমিটার সড়ক ভেঙ্গে ও গর্ত হয়ে যায়। এছাড়াও ২৯টি স্থানে আড়াই কিলোমিটার বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়াসহ ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৮০ কিলোমিটার বাঁধ। প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধানের চারা মরে যাওয়াসহ বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক কিছুর ক্ষতি সাধিত হয়।

দিনাজপুরে ভয়াবহ বন্যার ২ বছর পূর্তি হতে চলেছে। ২০১৭ সালের আগষ্ট মাসে হয়ে যাওয়া ভয়াবহ এই বন্যার মূল কারন ছিল বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়া। বন্যা পরবর্তী সময়ে মানুষজনের যে ক্ষতি হয়েছিল তার হয়তো অনেকেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠেছেন, নদীর বাঁধগুলোও মেরামত হয়েছে। কিন্তু ওই সময়ে এলাকাবাসীর যে দাবি ছিল সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী সমাধান তা এখনও পুরন হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ইতিমধ্যেই সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী নদী তীর সংরক্ষণ কাজ, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও রেগুলেটর নির্মাণের জন্য ৪৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা করা হয়েছে। এই প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে বন্যার হাত থেকে সম্পূর্ণভাবে রক্ষা পাবে দিনাজপুরবাসী।

বন্যা পরবর্তী সময়গুলোতে ভেঙ্গে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ মেরামত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বছরও নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে ৪টি স্থানে ঝুকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এসব কাজ সম্পন্ন হলে বর্ষার এই সময়টাতে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে।

চলতি বছরের ৬ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দিনাজপুরে ৪৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। একইসাথে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে ওই সময়ে দিনাজপুর জেলার সদর, বিরল ও চিরিরবন্দর এলাকার গোষ্ঠের ডাঙ্গা, রাজারামপুর ও মাধবপুর এলাকায় নদী তীরের বাঁধগুলো ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠে।

এরূপ অবস্থায় সদর উপজেলার গোষ্ঠের ডাঙ্গায় গর্ভেশ্বরী নদীর উৎসমুখে ক্রস বাঁধটি হুমকির মধ্যে পড়লে দিনাজপুর শহরে পানি প্রবেশের উপক্রম হয়। পরে সেখানে বালুর বস্তা ফেলাসহ যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে টেকানো হয়। পরে পানি নেমে গেলেও আবারও বন্যার ঝুকি থেকে মুক্ত হতে সদর উপজেলার গোষ্টের ডাঙ্গা ও কর্নাই এবং বিরল উপজেলার রাজারামপুর ও মালঝাড় এলাকা মিলে ৪টি স্থানে ঝুকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ‘আপদকালীন কাজ’র অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই এসব বাঁধ মেরামত প্রায় শেষের দিকে। যাতে করে এবারে বৃষ্টিপাতে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও এসব ঝুকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙ্গে এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

দিনাজপুরে নদীর বাঁধ ভাঙ্গন ঠেকাতে স্থায়ী সমাধানের দাবি Dinajpurnews দিনাজপুরনিউজ I+এলাকার লোকজন জানান, ২০১৭ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ওইসব স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করে দিনাজপুর শহরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই সময়ে বন্যার মূল কারন ছিল বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হওয়া। চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। কিন্তু ওই সময় বাঁধ মেরামতের ফলে ঝুকি কাটিয়ে উঠলেও ভাঙ্গন স্থানগুলোতে স্থায়ীভাবে সিসি ব্লক দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করার দাবী জানান তারা।

বিরলের রাজারামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে ভারী বর্ষণে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বাঁধটি প্রায় ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় ও ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। নদীতে পানি বৃদ্ধি অবস্থাতেই বাঁধ মেরামত কাজ হওয়ায় এবারে বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে ওই এলাকার বাধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করলে পুরোপুরিভাবে বন্যার কবল থেকে মুক্তি পাবে এলাকার লোকজন।

একই এলাকার সমসের উদ্দিন জানান, বন্যার সময়ে বাঁধের কাছাকাছি পানি এসে পৌছেছিল। যে কোন সময়ে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। বাঁধ মেরামতের কাজ করায় আমরা বেচে গেছি। তবে সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হলে আমরা চিরতরে বন্যার কবল থেকে মুক্তি পাব। একইসাথে নদী খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি তার।

সদর উপজেজলার গোষ্ঠেরডাঙ্গা এলাকার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাঁধ মেরামত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা চাইছি স্থায়ী সমাধান। যাতে করে বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ না হই। প্রতি বছরে একটু একটু করে মেরামত না করে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ আমাদের মঙ্গল বয়ে আনবে। এই দাবিটি আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরকেও জানিয়েছি।

বাঁধ মেরামতের দায়িত্বে থাকা দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এটিএম সাইফুল ইসলাম খন্দকার জানান, ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় মেরামত করে বন্যা ঠেকানো হয়েছে। যদি মেরামত না করা হতো তাহলে বাঁধটি ভেঙ্গে পড়তো। এই রকম গোষ্ঠের ডাঙ্গা, কর্ণাই ও মালঝাড়সহ বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ বাঁধে মেরামত কাজ করা হয়েছে এবং এখনও তা চলমান রয়েছে। যাতে করে এই বর্ষাতে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও ওইসব স্থান ভেঙ্গে প্লাবিত না হয়। তবে বাঁধগুলোতে স্থায়ী সমাধান হিসেবে সিসি ব্লক দ্বারা নদী তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয় থেকে প্ল্যানিং কমিশন পার করেছে। এরপর প্রি-একনেকে পাশ হয়ে একনেকে অনুমোদন হলেই বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে। যাতে করে এই এলাকার মানুষকে আর বন্যার আতঙ্কে দিনাতিপাত করতে হবে না।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফইজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে ভারী বর্ষন ও উজানের ঢলে যাতে করে বাঁধের ক্ষতি না হয় সেজন্য মেরামত কাজ চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যেই সিসি ব্লক দ্বারা স্থায়ী নদী তীর সংরক্ষণের জন্য ৪৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা করা হয়েছে। যা মন্ত্রণালয় ও প্ল্যানিং কমিশন অনুমোদন দিয়েছেন। এখন প্রি-একনেক ও একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এই প্রকল্পে সিসি ব্লকের বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, রেগুলেটর নির্মাণসহ বন্যা ঠেকাতে সব ধরনের কাজ করা হবে। আত্রাই নদীর ডান তীরে ২.৯০০ কিলোমিটার স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ এবং সদর, বিরল ও বোচাগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঢেপা, পূনর্ভবা ও টাঙ্গন নদীর ভাঙ্গন রোধে ১০ কিলোমিটার স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজের ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন হলে ওইসব বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। যাতে করে বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে এই এলাকার মানুষজন পাশাপাশি তাদের দাবি বাস্তবায়ন হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য