দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দিনাজপুরে হাইকোর্টের ভুয়া রিটের আদেশ সৃষ্টি করে ইট প্রস্তুত করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার তদন্তভার সিআইডি পুলিশকে প্রদান করে তাদের নিকট মামলার নথিপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে।

দিনাজপুর পার্বতীপুর থানার অফিসার্স ইনচার্জ মোকলেসুর রহমান জানান, ৫ আগষ্ট পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তভার সিআইডি পুলিশকে প্রদান করায় মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদেরকে হস্তান্তর করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক মোঃ মিজানুর রহমান জানান, তিনি এই মামলার তদন্তের ভার গ্রহণ করে ৬ আগষ্ট দিনাজপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট শিশির কুমার বসুর আদালতে হাজতে আটক ২৮ আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন।

বিচারক বুধবার হাজতে আটক এই মামলার আসামী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এজেডএম রেজওয়ানুল হক, ফুলবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মিল্টনসহ ২৮ আসামীর আদালতে উপস্থিত হয়ে দুপুর ২টায় রিমান্ড শুনানি শুরু হয়।

দীর্ঘ দেড়ঘন্টাব্যাপী রিমান্ড শুনানিতে বাদী পক্ষে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক ইসরাইল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক মোঃ আব্দুল মজিদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। অপরদিকে আসামীপক্ষে দিনাজপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডঃ নুরুজ্জামান জাহানী, সাধারণ সম্পাদক এ্যাডঃ তহিদুল ইসলাম সরকারসহ প্রায় ৩০ জন আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শুনানি করেন। বিচারক মামলা শ্রবণ করে পরবর্তীতে আদেশ দিবেন বলে ঘোষণা দিয়ে হাজতে আটক ২৮ আসামীকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

আদালতের একটি সূত্রে জানা যায়, এই মামলায় আটক অপর আসামী পার্বতীপুর উপজেলার বিলাইচন্ডী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোঃ মোকাররম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারক ওই আসামীকে ২ দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদেশ দেন।

উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এই মামলার ২৮ আসামী হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে আগাম জামিনের আবেদন করলে ওই বেঞ্চ ৩ সপ্তাহের জন্য সময় দিয়ে তাদেরকে দিনাজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেয়ার আদেশ দেন। উক্ত আদেশের প্রেক্ষিতে ওই ২৮ আসামী ২৯ জুলাই আইনজীবীর মাধ্যমে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক তাদের জামিন না দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

জামিন বাতিল হওয়া আসামীরা হলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এজেডএম রেজওয়ানুল হক (৬৩), ফুলবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আতাউর রহমান মিল্টন (৪৮), ইটভাটা মালিক রবিউল আলম মুন্সি (৪৫), মোঃ মাসুদ রানা (৪২), মোঃ নুরে আলম (৫০), মোঃ ইব্রাহিম আলী মন্ডল (৫২), মোঃ রবিউল হাসান (৪২), মোঃ ফখরুল ইসলাম শাহ ওরফে সাজু (৪২), মোঃ নাজমুল হুদা (৪০), মোঃ রফিকুল ইসলাম (৪৫), মোঃ রফিকুল ইসলাম বেগ (৪২), মোঃ রেজওয়ানুল হক (৪৫), মোঃ মাহফুজুল হক আনার (৪৮), মোঃ তাসরিফুল (৪২), মোঃ মাসুদুর রহমান চৌধুরী (৪০), মোঃ আমানুল্লাহ প্রমানিক (৪৮), শাহরিয়ার ইফতেখারুল আলম চৌধুরী (৩৮), মোঃ নজরুল ইসলাম (৪২), মোঃ জিকরুল হক (৪০), এসএম হায়দার (৫০), মোঃ রেজাউল ইসলাম (৫৫), শ্রী পলাশ কুমার রায় (৪৫), মোঃ শফিকুল ইসলাম (৩৮), আবুল কালাম আজাদ (৫০), পলিন চন্দ্র রায় (৪২), মোঃ লোকমান হাকিম (৫২) ও মোঃ মঞ্জুরী-ইশ-শাহাদাৎ মতিন (৪৪), মোঃ হাসান শাহরিয়ার (৪৫)।

এছাড়া এই মামলার এজাহারনামীয় ২৭নং আসামী পার্বতীপুর উপজেলার ইউপি চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেনকে ১৭ জুলাই পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে। মামলার অপর ২ এজাহারনামীয় আসামী মোঃ শফিকুর রহমান ও মোঃ কুদরতই খোদা এখনও পলাতক রয়েছে।

দিনাজপুর কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক মোঃ ইসরাইল হোসেন জানান, মামলাটি ২২ জুন পার্বতীপুর থানায় এসআই আব্দুল হামিদ বাদী হয়ে ৩১ জন ইটভাটা মালিককে আসামী করে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে দায়ের করে। যার পার্বতীপুর থানার মামলা নং- ২৩, তারিখ ২২/৬/১৯, ধারা ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৩৪ দঃ বিঃ।

মামলার অভিযোগে প্রকাশ, গত বছর ১১ মার্চ পার্বতীপুর উপজেলার হযরতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশু ছাত্রী মায়িশা মনাওয়ারা মিশু দিনাজপুর জেলা প্রশাসক বরাবর একটি পত্র লেখে। ওইপত্রে শিশু ছাত্রী লেখেন আমাদের স্কুলের পাশ্বে বিপ্লব নামের ১ জন লোক ইটভাটা দিয়েছে।

ইটভাটার কালো ধোয়ায় আমাদের শ্বাসকষ্ট হয়। পরিবেশের ক্ষতি হয়। চোখ জ্বালা করে। এখন স্কুলের অপর পার্শ্বে মুক্তা নামের ১ জন লোক আরেকটি ইটভাটা প্রস্তুত করেছে। তাহলে আমাদের কি হবে। আমরা কিভাবে বাচবো। আপনি আমাদের বাচান। ওই পত্র প্রাপ্তির পর জেলা প্রশাসক ভাটাগুলোর কি অবস্থা তদারকি করে অবগত হন হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে তারা ভাটায় ইট পোড়াচ্ছেন। হাইকোর্টে অনুসন্ধান করে জেলা প্রশাসক জানতে পারে ভুয়া রীট দায়ের করে ভুয়া হাইকোর্টের আদেশ সৃষ্টি করে ইট পোড়ানো হচ্ছে।

বিষয়টি ২০ মে মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি মোঃ আশরাফুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে জেলার ৩১টি ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।

দিনাজপুর পুলিশ সুপার সৈয়দ আবু সায়েম জানান, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে পার্বতীপুর থানার এসআই মোঃ আব্দুল হামিদ গত ২২ জুন মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামী রয়েছে ৩১ জন ইটভাটার মালিক।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মোঃ মাহমুদুল আলম জানান, আমি পার্বতীপুর উপজেলার দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশু মায়িশা মিশুর ১টি মানবিক আবেদনমুখী পত্রের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মহামান্য হাইকোর্টের শরনাপন্ন হই। হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদ্বয়ের নির্দেশেই এই মামলা দায়ের হয়েছে। অপরাধী ইটভাটা মালিকেরা যাতে তাদের অপকর্মের বিচার হয় এই প্রত্যাশাই তিনি করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য