অনেকবার প্রেসক্লাব চত্বরে এসেছেন। প্রতিদিন পত্রিকায় পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখেছেন খবরের এপাশ ওপাশ। সাংবাদিকতার ত্রিশ বছরে ধরে তুলে ধরেছেন সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের কথা। লিখেছেন দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য। প্রেসক্লাবে আসতেন আবার বিদায়ও নিতেন। কিন্তু হঠাৎ ব্রেইন স্টোক করার পর আর নিয়মিত আসা হয়নি প্রেসক্লাবের বারান্দায়।

দীর্ঘদিন দেশে বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন। কারো সাথে দেখা হলে বিদায় বেলায় সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজ যখন প্রেসক্লাব চত্বরে এলেন, তখন কোন শব্দ নেই তার মুখে। নির্বাক হয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন কফিনে।

বলছিলাম সাংবাদিক শাহাজাদা মিয়া আজাদের কথা। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন। বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের জনপ্রিয় নাট্যকার ও অভিনেতা হিসেবেও খ্যাতি ছিলো তার। যেমন কলম সৈনিক হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তেমনি নাটকেও তার ক্ষুরধার সংলাপ রচনায় ছিলো ঈর্শ্বনীয় পারদর্শিতা। প্রিয় এই মানুষটির মৃত্যুতে শোকাহত তার সহকর্মীরা রংপুরের বিভিন্ন মহল।

বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) দুপুর সোয়া এগারোটায় সাদা কাপড়ে মোটানো শাহাজাদা মিয়া আজাদের মরদেহ প্রেসক্লাব চত্বরে নিয়ে আসা হয়। একনজর দেখা ও শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতায় তার সহযোদ্ধা সহকর্মীরা। শ্রদ্ধা জানিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতারা। দুপুর ১২টায় সেখানে প্রথম নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

বাদ যোহর মাহিগঞ্জ তালতলা জামে মসজিদে দ্বিতীয় নামাজের জানাজা শেষে মাহিগঞ্জ কবর স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এতে অংশ নেন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন মিডিয়ায় কর্মরত রংপুরের সাংবাদিকরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ। জানাজা শেষে আজাদের বিদায় যাত্রায় বেলায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তার সহকর্মী-শুভাকাঙ্খীরা। অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় কফিনের পাশে নিরবতা পালন করেন সবাই।

এদিকে সাংবাদিক শাহাজাদা মিয়া আজাদের মৃত্যুতে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে রংপুর জেলা প্রশাসন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জাসদ, বাসদ, ওয়াকার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্র, সাংবাদিকদের সংগঠন প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব, সিটি প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, ভিডিও জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক ইউনিয়ন, নেতৃবৃন্দ। জানাজার আগে মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়।

উল্লেখ্য,গতকাল বুধবার রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাজাদা মিয়া আজাদ মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

শাহাজাদা মিয়া আজাদ শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, ছিলেন নাট্যকার ও নাট্যশিল্পী হিসেবেও পরিচিত। আশির দশকে কারমাইকেল কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। কাকসু ছাত্রসংসদে নাট্য ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ধান-চাল শুকানোর চালাত ব্যবসার সময়ে লেখালেখির অভ্যাস থেকে দৈনিক যুগের আলো পত্রিকা দিয়ে তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এরপর বিভিন্ন সময়ে দৈনিক দাবানলসহ ঢাকার কাগজে লিখেছেন। সবশেষ তিনি জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ২৪ ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতায় নির্ভীক কলম সৈনিক হিসেবে একাধিক পুরষ্কার অর্জনের পাশাপাশি তিনি অগণিত মানুষের প্রসংশাও কুড়িয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য