নীলফামারীর সৈয়দপুর চিলাহাটি ৫৪ কিমি রেলপথে ২১টি লেভেলক্রসিং অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এতে করে এসব অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে যে কোন মুর্হূতে বড় ধরণের দূর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ সহকারী প্রকৌশলী কার্যালয় সৈয়দপুর সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দপুর থেকে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি রেল ষ্টেশন পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ ৫৪ কিলোমিটার। ওই দূরত্বে ৩৬টি লেভেলক্রসিং রয়েছে।

এ সবের রয়েছে বৈধ লেভেলক্রসিং ৩৩টি এবং অবৈধ ৩টি। আর বৈধ লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান আছে মাত্র ১২টি। কয়েকটিতে আবার গেটম্যান থাকলেও নেই গেট (ব্যারিয়ার) কিংবা ট্রেনের খবরাখবর নেওয়ার মতো কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা। যে সব লেভেল ক্রসিং গেটম্যান রয়েছে ষ্টেশন মাষ্টারের সঙ্গে তাদের কোন রকম যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। তারা মূলতঃ আগের স্টেশনের গেটম্যানের সঙ্গে নিজস্ব মুঠোফোনে ট্রেনের খবরাখবর নিয়ে গেটে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ট্রেন পার করে থাকেন।

অনেক সময় পূর্বের স্টেশনের গেটম্যান মোবাইল ফোন রিসিভ করেন না। তখন মূলতঃ লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেন আসা দেখে লেভেল ক্রসিংয়ে বাঁশ লাগিয়ে যানবাহন আটকিয়ে ট্রেন পার করেন। আর রাতের বেলা ট্রেনের আলো দেখে কিংবা হুইসেল শুনে দায়িত্ব পালন করেন। স্টেশনের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় সময় ট্রেন আসার অনেক আগেই লেভেলক্রসিংয়ে বন্ধ করতে হয়।

এ নিয়ে অনেক সময় পথচারী কিংবা যানবাহন চালকদের সঙ্গে তাদের বাকবিতন্ডা এমনকি হাতাহাতির মত ঘটনা ঘটে। তাছাড়া যে ঘুন্টিঘরগুলো রয়েছে সেখানে নেই বিদুৎ ও পানির ব্যবস্থা। ফলে রাতে ঘুন্টিঘরে চার্জার কিংবা মোমবাতি জ¦ালিয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে গেটম্যানদের। আর তাদের দৈনন্দিন প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারতে হচ্ছে পাশের ঘুন্টিঘরের আশপাশের বাড়িতে গিয়ে।

এ নিয়ে অনেক সময় তারা চরম বিব্রতকর অবস্থার সম্মূখীন হতে হয় তাদের। এমন একটি হচ্ছে সৈয়দপুর-চিলাহাটি রেলপথের ই/১২৮ নম্বর লেভেল ক্রসিংটি। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের পোড়াহাট এলাকায় ওই লেভেল ক্রসিংয়ে বিগত ২০১৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতে এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটে। ওই দিন দিবাগত রাত ১১টায় সৈয়দপুর থানার পিকআপ ভ্যান যার নং নীলফামারী ঠ ১১-০০১০ সৈয়দপুর-চিলাহাটি রেলপথের পোড়ারহাট রেলগেটটি অতিক্রম করছিল।

এ সময় নীলফামারী থেকে ছেড়ে ঢাকাগামী আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর পুলিশ পিকআপ ভ্যানটিকে ধাক্কা দেয়। এতে পুলিশ পিকআপ ভ্যানটি রেলপথের পাশে ছিঁটকে পড়ে। ওই সময় পুলিশের পিকআপ ভ্যানে থাকা ৪ পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান এবং আহত হয় সৈয়দপুর থানার তৎকালীন ওসি ইসমাইল হোসেন সহ কয়েক পুলিশ সদস্য।

পোড়াহাট লেভেলক্রসিংয়ে ওই দূর্ঘটনার পর সেখানে একটি নতুন করে ঘুন্টিঘর তৈরী করা হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় দুইজন গেটম্যানকে। আর ব্যারিয়ার বসানোর জন্য অবকাঠোমো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ব্যারিয়ার লাগানো হয়নি অদ্যাবধি। ফলে ঢেলাপীরবাজার থেকে বড়ুয়াহাট সড়কে ওই লেভেল ক্রসিংয়ের এক পাশে বাঁশ দিয়ে এবং অপর পাশে গেটম্যান দাঁড়িয়ে যানবাহন আটকিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। সৈয়দপুর-চিলাহাটি রেলপথে আরও বেশ কিছু অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে যেগুলোতে নেই গেট কিংবা গেটম্যান। পোড়াহাট এলাকায় ই/১২৮ নম্বর লেভেলক্রসিংয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, এক কক্ষবিশিষ্ট একটি ঘুন্টিঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

গেট লাগানোর জন্য পাকা ও লোহার কিছু অবকাঠোমো বসানো হয়েছে। কিন্তু ব্যারিয়ার আর লাগানো হয়নি। বেলা ১ টা ৩৮ মিনিটে ওই লেভেলক্রসিং অতিক্রম করে রাজশাহী থেকে চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনটি। এ সময় দায়িত্বরত গেটম্যান মামুনুর রশীদ করিম ওই লেভেলক্রসিংয়ের এক পাশে একটি বাঁশ আটকিয়ে এবং অপর প্রান্তে নিয়ে দাঁড়িয়ে ঢেলাপীর বড়ুয়াহাট সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে ট্রেন পার করছিলেন। এ সময় উলি¬খিত সড়কের উভয় পাশে দাঁড়িয়ে যায় শত শত বিভিন্ন যানবাহন।

গেটম্যান করিম জানান, প্রায় দেড় বছর যাবৎ ওই লেভেল ক্রসিংয়ে তিনি দায়িত্বপালন করছেন। তিনি ছাড়াও আরো একজন গেটম্যান ওই লেভেলেক্রসিংয়ে দায়িত্বে রয়েছে। তাদের কোন রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। লেভেল ক্রসিংয়ে গেট না থাকায় তিনি স্থানীয়ভাবে একটি বাঁশ যোগাড় করেছেন। আর সেই বাঁশ দিয়েই সড়কে যানবাহন আটকিয়ে ট্রেন পার করছেন।

পোড়াহাট লেভেলক্রসিংয়ে দায়িত্বপালন করতে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কারণ এই লেভেলে ক্রসিং দিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শত হাজার হাজার পথচারীসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। বর্তমানে ওই লেভেল ক্রসিংয়ে তিনজন গেটম্যান থাকার কথা থাকলেও তারা দুইজন রয়েছেন। ফলে তাদের ১২ ঘন্টা একটানা কাজ করতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাাংলাদেশ রেলওয়ের সৈয়দপুরের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুলতান মৃধা সৈয়দপুর চিলাহাটি রেলপথে কয়েকটি লেভেলক্রসিংয়ে বাঁশ দিয়ে যানবাহন আটকানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওই সব লেভেলক্রসিংয়ে ইতোমধ্যে অবকাঠামো বসানো সম্পন্ন হয়েছে, খুব শিগগিরই ব্যারিয়ার লাগানোর কাজ শেষ হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য