উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টিপাতে প্রতিদিনই বন্যার পানি বাড়ছে গাইবান্ধায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার পাঁচ উপজেলার চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাঁধ ও ব্রিজ ধসে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। তলিয়ে গেছে গাইবান্ধা পৌর শহরের অধিকাংশ এলাকা। পানিবন্দি মানুষ বাঁধ ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। পানি ওঠায় চার উপজেলার আড়াই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানিতে ডুবে সুন্দরগঞ্জে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, বিভিন্ন সড়কে পানি ওঠায় এবং তীব্র স্রোতের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বুধবার (১৭ জুলাই) সকালে বাদিয়াখালি এলাকায় রেললাইনে পানি ওঠায় অন্যান্য জেলার সঙ্গে গাইবান্ধার ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সড়কের বেশ কয়েকটি পয়েন্টসহ ব্রিজ ও কালভার্ট। প্রবল স্রোতে গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়কের বাদিয়াখালী ভাঙ্গামোড় ও উল্যা ভরতখালী, গাইবান্ধা-বালাসী ও কালিরবাজার সড়ক এবং গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের খোলাহাটির কদমেরতল এলাকায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার সঙ্গে ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে, শহর রক্ষা বাঁধ ধসে গাইবান্ধা-সাদুল্লাপুর সড়কের কাজলঢোপ এলাকায় প্রবল বেগে পানির স্রোত বইছে। ফলে সড়ক দিয়ে যাতায়াতে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া সদরের বানিয়ারজান, বাগুড়িয়া, ফুলছড়ির কাতলামারী, সোনাইল এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাঁচটি পয়েন্টে ধস দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কামারজানি, সিংড়া, পুলবন্দিসহ কয়েকটি এলাকার বাঁধ। পানির তোড়ে যেকোনও সময় বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিতসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ধসে যাওয়া সড়ক, ব্রিজ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতে বালুর বস্তা ফেলে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় যানবাহন চলাচলে সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানোসহ দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

বাঁধ ও সড়ক ধসে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে পৌর এলাকা ও সাদুল্যাপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি পৌরবাসী।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নের ২৩০টি গ্রামের সাড়ে তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নতুন করে গাইবান্ধা পৌরসভা ও সাদুল্যাপুরে পানি ঢুকে পড়েছে অর্ধশতাধিক গ্রামে। বর্তমানে পাঁচ উপজেলার তিনশরও বেশি গ্রামের তিন লাখ ৮৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্যায় বুধবার (১৭ জুলাই) পর্যন্ত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০ হাজার ২৩০টি। রাস্তাঘাট ডুবে গিয়ে কাঁচা রাস্তা ৯২ কি.মি, ছয়টি কালভার্ট ও চার কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া পাঁচ উপজেলার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে ৩৩২টি পুকুর ও খামারের মাছ।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের গাইবান্ধার ত্রাণ ও দুর্যোগ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার বন্যাকবলিত মানুষের আশ্রয়ের জন্য ১১৪টি কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে ৪২ হাজার ১০২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য বুধবার পর্যন্ত জেলা ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার মেট্রিক টন চাল, নগদ ১০ লাখ টাকা ও চার হাজার কার্টুন শুকনো খাবার। এর মধ্যে শুকনো খাবারের প্যাকেট ও নগদ টাকাসহ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেট্রিক টন চাল বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি চালগুলোও বিতরণে কাজ চলছে। দুর্গত এলাকার মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে ১২০টি মেডিক্যাল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। তবে বন্যায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা তুলে দিতে আরও এক হাজার টন চাল, ১০ লাখ টাকা ও ১০ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুত আছে।’

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক (রুটিন দায়িত্ব) মোছা. রোকসানা বেগম বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দুর্গত এলাকা ও বাঁধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের আশপাশের সবাইকে সতর্কাবস্থায় থাকতে মাইকিং করা হয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষকে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ, আনসারসহ পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’

এদিকে, গাইবান্ধা পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবীর মিলন বলেন, ‘পৌর এলাকার পানিবন্দি মানুষের জন্য ১০টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের প্রায় তিন হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।’

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন এবিএম আবু হানিফ বলেন, ‘বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১০৯টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। প্রত্যেকটি টিমে তিন থেকে পাচঁ জন করে রয়েছেন। এছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধপত্র পর্যাপ্ত রয়েছে।’ পর্যায়ক্রমে আশ্রয়কেন্দ্রসহ দুর্গত এলাকার মানুষকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হবে বলেও আশা করেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য