সদ্য শেষ হওয়া কাতার সম্মেলনের শান্তি আলোচনায় আফগান প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘শান্তির পথরেখা’ তৈরিতে রাজি হয়েছে তালেবান প্রতিনিধিরা। দিয়েছে নারীদের অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি।

কিন্তু কঠোর অনুসাশনে বিশ্বাসী তালেবানে আস্থা নেই নারীদের। তাই তালেবানের ওই প্রতিশ্রুতির পরও সেই হাড়হিম করা পুরোনো যুগই আবার ফিরে আশার আশঙ্কায় আছে আফগান নারীরা।

নারীদের জন্য ভয়ংকর সেইসব দিনের আলামতও এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের নারীরা তালেবানের আবার ফিরে আসা নিয়ে কী ভাবছে- তা জানতে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার এক প্রতিনিধি সেখানে গিয়েই এমন আলামত পেয়েছেন।

আফগানিস্তানের বিপজ্জনক প্রদেশ কান্দাহারের প্রথম এবং একমাত্র নারী আইনজীবী জয়নব ফয়েজের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার সময়ই ওই প্রতিনিধি জানতে পারেন, জয়নব শহর ছেড়ে পালিয়েছেন। একের পর এক হুমকির মুখেই পালাতে বাধ্য হন জয়নব। পুরুষদেরকে কারাগারে পাঠানোর কারণে তালেবানের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছিলেন তিনি।

মাত্র ২৯ বছর বয়সেই আইনজীবী জয়নব ফয়েজ আফগান নারীদের বড় রক্ষক রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। স্ত্রী বা বাগদত্তাকে মারধর ও নিপীড়নের অভিযোগে ২১ জন পুরুষকে কারাগারে পাঠিয়েছেন তিনি।

আফগানিস্তানের দক্ষিণের প্রত্যন্ত অঞ্চল কান্দাহারে তালেবান জঙ্গিরা অত্যন্ত সক্রিয়। কান্দাহারে মেয়েদের শিক্ষার ‍অধিকারই যেখানে হুমকির মুখে সেখানে একজন নারী আইনজীবী নারীদের হয়ে আদালতে লড়াই করে পুরুষদের কারাগারে পাঠাচ্ছেন।

তালেবানের ঘাঁটি কান্দাহার তা মেনে নেবে কেন? তাই একের পর এক হুমকি পেতে থাকেন জয়নব। একদিন তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডে কেউ গুলি দিয়ে মোড়ানো একটি হাতে লেখা চিঠি রেখে যায়। চিঠিতে লেখা ছিল, “এখন থেকে আপনিই আমাদের লক্ষ্য এবং আমরা আপনার সঙ্গে অন্যান্য পশ্চিমা ‍দাসেদের মত আচরণ করব।”

চিঠিতে ‘ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান’ (আফগানিস্তানের সাবেক নাম) স্বাক্ষর করা ছিল। দেশটির তালেবান জঙ্গিরা এখনো এ নাম ব্যবহার করে। এ হুমকি উপেক্ষা করতে না পেরেই কান্দাহার ছেড়ে পালান জয়নব।

নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এর ওই প্রতিনিধি পরে জয়নবকে খুঁজে বের করেন। তিনি বলেন, “আমি তাকে রাজধানী কাবুলে খুঁজে পাই। সেখানে এক আত্মীয়র বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তার স্বামী ফখরুদ্দীন কিছুক্ষণ আগেই গাড়ি চলিয়ে কান্দাহার থেকে গুলি ও হুমকি দেওয়া চিঠি নিয়ে এসেছেন।” আগে কখনো এতটা ভয় পাননি বলে নিজেও জানান জয়নব।

যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে অভিযানের মাধ্যমে আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে তালেবান গোষ্ঠীকে উৎখাত করে। তারপর থেকেই দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র -তালেবান আলোচনা চলছে গত কয়েক বছর ধরে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গত সপ্তাহে কাতারের দোহা সম্মেলনে আফগানিস্তানে রক্তক্ষয়ের অবসান ঘটানোসহ নারীদের সুরক্ষায়ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে আফগান-তালেবান।

কিন্তু তালেবানের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে না আফগান নারীরা। তালেবান শাসনে তারা আর যেতেও চায় না। ফিরতে চায় না কথায় কথায় ফতোয়া, দোররা আর নির্বাসনের শিকার হওয়ার সেই দিনগুলোতে।

১৯৯০ সালে গহর প্রদেশে যখন জয়নবের জন্ম, আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ তখন ছিল তুঙ্গে। তালেবান শাসনের শুরুর দিকে বেড়ে উঠেছেন জয়নব। যখন মেয়েদের শিক্ষা বা চাকরির অধিকার ছিল না। নিষেধ অমান্যকারীদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হত।

তালেবান সরকার উৎখাত হওয়ার পর কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে লেখাপড়া করেন জয়নব। পরে পাস করে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। জয়নব যেসব পুরুষকে কারাগারে পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাও আছেন।

গত বছর আফগান সরকার জয়নবকে দেশের সেরা পাঁচ সাহসী নারীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কান্দাহার উপকণ্ঠে বিলবোর্ডে তার একটি ছবি দিয়ে লেখা হয়, ‘নারীদের অধিকার রক্ষার নায়ক’। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিপীড়িত নারীদের এগিয়ে আসা। তাকে দেখে ভরসা পাওয়া অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হওয়া নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন।

জয়নব বলেন, “আমার মামলাগুলোর খবর প্রকাশের পর নারীদের মধ্যে আইনের উপর বিশ্বাস বাড়তে থাকে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় হুমকি আসা। ইমেইল, ম্যাসেজ, হোয়াটসঅ্যাপ, মোবাইল ম্যাসেজ, ভয়েসমেইল কিছুই বাদ ছিল না। সব মাধ্যমেই একের পর এক হুমকি আসতে শুরু করে।”

সাহসী জয়নব ওইসব হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে তার সহকর্মী আজম আহমেদকে বন্দুকধারীরা অফিসে যাওয়ার পথে গুলি করে হত্যা করে। গৃহনির্যাতনের শিকার নারীদের বেশ কয়েকটি মামলায় আজম সাহায্য করেছিলেন বলে জানান জয়নব।

তার কথায়, “তিনি (আজম) খুবই সাহসী এবং একজন ভাল বন্ধু ছিলেন। তাকে হত্যার ঘটনা আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, আমি ভেঙে পড়ি। তারপরও আমরা কাজ চালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।”

কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর গুলিতে মোড়ানো ওই চিঠি পান জয়নব। ক্ষুব্ধ জয়নব বলেন, “একজন তালেবান তালেবানই হয়। ‍তারা প্রমাণ করেছে তারা ঠিক কী ধরনের মানুষ এবং তাদের আদর্শ কী। যদি ওই আদর্শ নিয়ে তারা আবারও ক্ষমতায় আসে তবে আবার সব আগের মতই হয়ে যাবে।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য