আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট: কয়েকদিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে লালমনিরহাটের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বন্যায়। পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে শহরে ঢুকছে প্রবল স্রোত।

শনিবার (১৩ জুলাই) সকাল ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫৩ দশমিক ০৪ সেন্টিমিটর। যা (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ সে.মি.) বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যা ৬ টায় ৩৫ সে.মি. ও রাত ৯টায় ৪৪ সে.মি. এবং মধ্যরাতে আরও বেড়ে গিয়ে তিস্তার পানি প্রবাহ বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার দিনগত মধ্যরাতে পানির তোড়ে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী তালেব মোড় এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে হাতীবান্ধা উপজেলা শহরে বন্যার পানি প্রবেশ করে। বন্যায় প্লাবিত হয় নতুন নতুন এলাকা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে পানিববন্দির সংখ্যা।

ভারতের গজল ডোবা ব্যারেজে তিস্তার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় ওই ব্যারেজের গেট খুলে দেওয়ায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন ডালিয়া ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে উঠেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষকে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, উজানের পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি। এতে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। এর সঙ্গে বুধবার (১০ জুলাই) দিনগত মধ্যরাত থেকে তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। ভারী বৃষ্টিতে কিছু পরিবার মঙ্গলবার (০৯ জুলাই) দুপুর থেকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নৌকা বা ভেলা ছাড়া চরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ধেয়ে আসছে পাহাড়ি ঢল। এতে বড় সমস্যায় পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীরা।

এ বন্যায় জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার তিস্তার পানি প্রবাহ বাড়ায় নতুন নতুন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। ফলে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যাও বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি ভয়াবহ এ বন্যায় জেলার ৫টি উপজেলায় প্রায় ২৫/৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তার তীরবর্তী এলাকার ব্রিজ কালভার্ট ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। আদিতমারীর তিস্তার তীরবর্তী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি কুটিরপাড়, রজবপাড়া, অংশে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। একই এলাকার কুটিরপাড় বালুর বাঁধটিও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যার বেশ কিছু অংশ ইতোমধ্যে তিস্তায় বিলীন হয়েছে। হাতীবান্ধার গড্ডিমারী তালেব মোড়ের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চরম ঝুঁকিতে। যেকোন মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে বলে শ্বঙ্কিত স্থানীয়রা। বন্যায় ভেসে যাচ্ছে শত শত পুকুরের মাছ। নষ্ট হয়েছে চাষিদের বাদাম, ভুট্টা ও সবজিসহ নানান ফসল। পানি প্রবাহ ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তিস্তার তীরবর্তী মানুষ।

চরাঞ্চলের পানিবন্দি খেটে খাওয়া মানুষগুলো শিশুখাদ্য ও নিরাপদ পানির সমস্যায় পড়েছেন। টানা চার দিন পানিবন্দি থাকার পর শুক্রবার (১২ জুলাই) বিকেলে কিছু কিছু এলাকায় সরকারিভাবে ত্রাণ হিসেবে ১০ কেজি চাল বিতরণ করা হয়। চারদিকে অথৈ পানির কারণে জ্বালানি সংকটে রান্না করা যাচ্ছে না।এজন্য শুকনো খাবার পৌঁছানোর দাবি করেছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। তবে সরকারিভাবে শুকনা খাবার মজুদ না থাকায় তা বিতরণ করা হয়নি।

গোবর্দ্ধন বন্যা নিয়ন্ত্রণ স্প্যার বাঁধ-২ এলাকার আলম বাদশা, মিজানুর রহমান জানান, আগে বন্যা হলে এক দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে যেত। এবারের বন্যায় টানা ৪/৫ দিন ধরে পানিবন্দি হলেও পানি কমছে না। আগে বন্যা শুরুতে সরকারিভাবে শুকনো খাবার দেয়া হত এবছর সেটাও নেই। বন্যার জন্য নেওয়া আগাম প্রস্তুতির শুকনো খাবার প্রায় সকল বাড়িতে শেষ হয়েছে। সবাই নিদারুন কষ্টের মধ্যে পড়েছেন শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে।

হাতীবান্ধা উপজেলার চর সিন্দুর্না গ্রামের আলতাব উদ্দিন ও আবু তালেব বলেন, এমন বন্যা তো দেখিনি। পানি শুধু বেড়েই চলেছে। ঘর বাড়ি রাস্তা ঘাট সর্বত্রই পানি আর পানি। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় বাড়ির অনেকেই জ্বর শর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। বাজারে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা শিশুদের সিরাপও পাওয়া যাচ্ছে না। সংকট দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, এ ইউনিয়নের সাড়ে তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি হলেও বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ১২ মেট্রিকটন জিআর চাল। যা মাথাপিছু ১০ কেজি হারে মাত্র এক হাজার দুইশত পরিবারের মধ্যে শুক্রবার বিতরণ করা হয়েছে। অধিকাংশ মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

আদিতমারী উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মফিজুল হক বলেন, বন্যার্তদের জন্য ১২ মেট্রিকটন জিআর চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শুক্রবার বিকেলে তা বিতরণ করা হয়েছে। তবে শুকনো খাবারের প্রয়োজন থাকলেও বরাদ্দ না থাকায় দেওয়া হচ্ছে না।

হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রান ও পুনবাসন কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম জানান, তার উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন তিস্তা নদীর অববাহিকায়। তিস্তায় সামান্য পানি বাড়লেই কিছু পরিবার পানিবন্দি হন। তালেব মোড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শহরে পানি প্রবেশ করেছে। নতুন নতুন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য