জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ ৫.৫ শতাংশে আটকে ধরে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামের শ্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের বিশাল ঘাটতির প্রস্তাবিত স্মার্ট বাজেটে ২০৪১ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপক পরিকল্পনা থাকলেও সারাদেশে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও রংপুর বিভাগে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য।

তাই এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রংপুর অঞ্চলের দারিদ্র নিরসন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে রংপুর বিভাগের জন্য পোশাক ও কৃষি ভিত্তিক শিল্প জোন গড়ে তোলার পাশাপাশি উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে রংপুর বিভাগের আট জেলার উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি এ বিভাগের শিল্পায়নে আলাদা ঋণ, কর ও ভ্যাট নীতি প্রণয়ন, বোরো মৌসুমে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া কৃষকদের স্বস্তি দিতে বিশেষ প্রণোদনা, রংপুরে প্রস্তাবিত স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও আইটি পার্ক স্থাপন, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে ‘‘নর্থ বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট মিনিস্ট্রি’’ গঠনের মত বিষয়গুলো অর্ন্তভূক্ত থাকা উচিত ছিল বলে রংপুর চেম্বার মনে করে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, বাজেটে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রংপুর বিভাগের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের জন্য তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব না থাকায় রংপুর চেম্বার হতাশ। তাই রংপুর অঞ্চলের দারিদ্র্য নিরসন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে রংপুর চেম্বারের প্রস্তাবগুলো সংশোধিত বাজেটে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য রংপুর চেম্বারের সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

তবে প্রস্তাবিত বাজেটে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়ে অর্থ পাচার রোধ ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শিল্পে বিনিয়োগ করলেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তরুণদের জন্য স্বল্প সুদে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে ঋণ তহিবল গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ ভৌত অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) বিশেষ গুরুত্ব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভূক্তি, ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে পুনঃঅর্থায়ন, রূপকল্প বাস্তবায়নে রপ্তানিতে নগদ সহায়তা, মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, কৃষকের শস্য বীমা চালু, বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে প্রণোদনাসহ বিদ্যমান কর অবকাশের (ট্যাক্স হলিডে) মেয়াদ বৃদ্ধি, অর্থপাচার রোধে কঠোর নজরদারি, নতুন করদাতার খোঁজে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা, প্রবাসী আয় ও রফতানিতে প্রণোদনা, শেয়ারবাজার চাঙ্গায় প্রণোদনা, জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি কমিয়ে আবাসন খাতকে চাঙ্গা করার চেষ্টা, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি, টার্ণওভারের সীমা বৃদ্ধি, প্রবাসীদের বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ, অনুন্নত এলাকা, চরাঞ্চল এবং প্রান্তিক এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, দেশের কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণে কৃষি খাতে অধিক হারে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এর ফলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে রংপুর চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি’র সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু প্রস্তাবিত বাজেটকে জনকল্যাণমূলক ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবমূখী বলে মনে করেন।

এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে ‘আমার গ্রাম আমার শহর কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য স্বল্প সুদে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে ঋণ তহিবল গঠন,মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা, শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের মুলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বেশ কিছু পণ্যের কাঁচামালের শুল্কহার হ্রাস, রপ্তানি পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি, বিলাস ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বহাল রাখা, হাতে তৈরি বিস্কুট, কেক, রুটি, স্বল্প মূল্যের জুতা এবং দেশীয়ভাবে মোটরসাইকেল ও রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বৃদ্ধিতে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বিকশিত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে রংপুর চেম্বার মনে করে।

বাজেটে নতুন ভ্যাট আইনে ২, ৫, সাড়ে ৭, ১০ এবং ১৫ শতাংশ- এই পাঁচটি রেট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বাজেটে একদিকে ভ্যাটের পরিধি ব্যাপক হারে বিস্তৃত করা হচ্ছে, তেমনি নিত্যব্যবহার্য কিছু পণ্যের ভ্যাটহার বাড়ানো হচ্ছে। এতে বাড়তে পারে ওইসব পণ্যের দাম। যা ভোক্তাকে ভোগাবে বলে রংপুর চেম্বার মনে করে। এছাড়া ওষুধ, জ্বালানি পণ্য পেট্রোলিয়াম ও নির্মাণ সামগ্রীর অন্যতম উপকরণ রড,বিভিন্ন জাতের মসলা, কাগজসহ বেশ কিছু পণ্যে নতুন আইন কার্যকর হলে ওই সব পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, যারা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেবেন, শুধু তারাই রেয়াত পাবেন। অপরদিকে, ১৫ শতাংশের নিচে অর্থাৎ ২, ৫, সাড়ে ৭ ও ১০ শতাংশ হারে যারা ভ্যাট দেবেন তারা রেয়াত সুবিধা পাবেন না। এক পক্ষ রেয়াত পাবে, অন্য পক্ষ রেয়াত পাবে না। একই আইনে দুই পদ্ধতি চালু করা হলে ট্যাক্স অন ট্যাক্স বা করের ওপর কর (দ্বৈত কর) আরোপ করা হবে। তখন পণ্য ও সেবার খরচ বাড়বে, যা ভোক্তার ঘাড়ে এসে পড়বে বলে রংপুর চেম্বার আশংকা প্রকাশ করছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ানোয় করদাতারা নতুন করে মূল্যস্ফীতির বাড়তি চাপে পড়বে এবং সাধারণ জনগণের কষ্ট বাড়বে বলে রংপুর চেম্বার মনে করে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস্তবে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা আসা উচিত ছিল বলে রংপুর চেম্বার মনে করে। এছাড়া বিড়ির ওপর সাম্প্রতিক সময়ে মাত্রা অতিরিক্ত করারোপের ফলে বিড়ি শিল্পনগরী হিসেবে খ্যাত রংপুরের হারাগাছের কারখানাগুলো দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কয়েক লক্ষাধিক বিড়ি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে-যা রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিতে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করছে। তাই রংপুর চেম্বার তামাক নির্ভর রংপুর অঞ্চলের কয়েক লক্ষাধিক শ্রমিক ও চাষীদের কথা বিবেচনা করে ভারতের ন্যায় বিড়ি শিল্পকে কুটির শিল্প হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি সংশোধিতবাজেটে তামাক পণ্যের ওপর যৌক্তিক হারে করারোপের প্রস্তাব করছে। এছাড়া বাজেটে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ফি’র ওপর ভ্যাটের পাশাপাশি সম্পূরক শুল্ক আরোপ ও মোবাইল গ্রাহকের কথা বলার ওপর বাড়তি কর আরোপ করায় সর্বসাধারণ বাড়তি করের চাপে পড়বে বলে রংপুর চেম্বার মনে করে।

পরিশেষে, বাজেটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমূহ অর্জনের নিমিত্তে বেসরকারী বিনিয়োগে প্রাণ ফেরানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখাসহ আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা, পন্থা, অর্থের সুষম বণ্টন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক কর্মসূচি ও কৌশল এমনভাবে প্রনয়ণ করতে হবে যাতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সুফল বয়ে আনতে পারে রংপুর চেম্বার সে কামনা করছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য