এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মনে নেই ঈদ আনন্দ। কারণ ধান বিক্রি করে তাদের উৎপাদন খরচই উঠছে না। এছাড়া ধানের বাজারে ক্রেতা নেই বললেই চলে। উৎপাদন খরচ পরিশোধ করতে অনেককে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগিসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ধানের দামের প্রভাব পড়ছে নীলফামারীর ঈদ বাজারে। ঈদের মাত্র কয়েকদিন বাকি কিন্তু এখনও জমেনি ঈদের কেনাকাটা। কাপড়ের দোকানগুলো প্রায় ক্রেতা শূন্য।

ধানের দাম না থাকায় ঈদের আনন্দ নেই দাবি করে নীলফামারী সদরের কচুকাটা ইউনিয়নের মানুষমারা গ্রামের কৃষক আলী হোসেন বলেন,‘ধান হাটোত নেয় না বাহে। তিন বিঘা জমিত বোরো ধান আবাদ করি কৃষাণের টাকায় উঠে না। হামার ফির ঈদ আছে নাকি?’

সদরের রামনগর ইউনিয়নের বিশমুড়ি গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, ‘বেশির ভাগ পরিবারই অর্থাভাবে ছেলে মেয়েদের জামা-কাপড় কিনে দিতে পারছে না। হাতে টাকা না থাকায় এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শতকরা ৮০ ভাগ কৃষক পরিবার। এবার ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক। পানির দামে দিলেও কেউ ধান নিতে চায় না। ধান এখন কৃষকের গলার কাটা হয়ে গেছে। হাটে পাইকারও পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন,‘প্রতিবারের মতো এবারও তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। ফলনও বাম্পার হয়েছে। প্রতি বিঘায় ২২ মণ করে ধান হয়েছে। ন্যায্য দাম পেলে সার ও পানির টাকা পরিশোধ করার পর ঈদে ইচ্ছেমতো খরচ করা যেত। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে ১১-১২ হাজার টাকা আর বিক্রি হচ্ছে ৯-১০ হাজার টাকায়। দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের ঝাড়সিংহস্বর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন,‘কিছুদিন আগে কাল বৈশাখীর ঝড় আর শিলা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বোরো ধানের ওপর মানুষের ভরসা ছিল। কিন্তু ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম না থাকায় কৃষককে মাঠে মরতে হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে ডিমলা উপজেলার হাজার হাজার কৃষককে।’

সরেজমিনে ঐতিহ্যবাহী নীলফামারীর বড় বাজারে গিয়ে দেখা গেছে দোকানগুলো প্রায় ক্রেতা শূন্য। স্মৃতি গার্মেন্টসের মালিক মকবুল হোসেন (৬৫) বলেন,‘ধানের ভরা মৌসুম। ধানের দাম না থাকায় কৃষকের হাতে টাকা নেই। আর এর প্রভাব পড়েছে ঈদের বাজারে। গত বছর ঈদের সাতদিন আগেই প্রায় লাখ টাকার বেচাকেনা হয়েছিল, এবার ঈদের মাত্র কয়েকদিন বাকি তবুও ক্রেতার দেখা নেই।’

জেলা শহরের বিপণি বিতানগুলো ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়েছে। সারা দিন আশানুরূপ বেচাকেনা না হওয়ায় আক্ষেপ করে রেশমা গার্মেন্টসের মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কৃষকের হাতে পয়সা না থাকায় বেচাকেনা করে লাভ করতে পারছি না। কর্মচারীর বেতন- ভাতা দেওয়াই সম্ভব হবে না হয়তো। ধানের বাজার না থাকায় প্রভাব পড়েছে ঈদের বাজারে। তাই ক্রেতাদের উপস্থিতি খুবই কম।’

জেলা শহরের কালিবাড়ী রোডের সাথী টেইর্লাসের মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন,‘ঈদ আসলে দিন-রাত কাজ করেও ক্রেতা সামাল দেওয়া যেতো না। এবার গ্রামের মানুষের হাতে টাকা না থাকায় কাজ নেই। প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে ধান কাটা শুরু হলে কাপড় কেনা ও সেলাইয়ের ধুম পড়ে যায়। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম।’

তিনি আরও বলেন,‘কৃষকের প্রধান ফসল ধান ও পাট। পাটের সময়ও দাম কম আর ধানের দাম তো একেবারেই নেই। তাই ঈদের কেনাকাটায় কৃষকের কোনও আগ্রহ নেই। যার কারণে বাজারগুলো ক্রেতা শূন্য। আমরা প্রতি বছর দুই ঈদ ও পূজায় ব্যবসা করে মহাজনের বাকি পরিশোধ করি। এবার মহাজনের দেনা-পাওনা পরিশোধ করা তো দূরের কথা দোকানের কারিগরের বেতন, সুতা, বোতাম, দোকান ভাড়া ও বখরমের টাকাই উঠবে না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য