এক বহুজাতিক সংস্থায় বহু টাকা মাইনের চাকুরে ছিল ঈশান। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, অনসাইটে বিদেশযাত্রা, সব মিিলয়ে সামনে কেরিয়ারের খাড়া সিঁড়ি, তরতর করে উঠে যেতে কোনও অসুবিধেই নেই। সোনালি স্বপ্নের ভবিষ্যৎ জ্বলজ্বল করছে সামনে। এ হেন ঈশানের সঙ্গে যখন রঞ্জিনীর আলাপ হল, দু’জনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে দেরি হয়নি। রঞ্জিনীও কলেজের লেকচারার, নিজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফল। অন্যদিকে পাত্র হিসেবে ঈশান যথেষ্ট লোভনীয়, ফলে আগ্রহের অভাব ছিল না রঞ্জিনীর পক্ষ থেকেও। বছরখানেক কোর্টশিপের পর দুই পরিবারের পূর্ণ সমর্থনে মহা ধুমধামে বিয়ে হয়ে যায় ঈশান-রঞ্জিনীর।

বিয়ের পরে দুটো বছর কেটে গেছিল স্বপ্নের মতো। স্বপ্নের তাল কাটতে শুরু করল বছর তিনেকের মাথায় এসে। প্রবল মন্দার হাওয়া লাগল সারা পৃথিবীতে, তার আঁচ এসে পড়ল কলকাতাতেও। ঝড়ের আওতা থেকে বাদ গেল না ঈশানের সংস্থাও। এক ধাক্কায় অর্ধেক করে দেওয়া হল সংস্থার কর্মীসংখ্যা। ছাঁটাইয়ের তালিকায় ঢুেক গেল ঈশানের নাম। হাতে কোম্পানির ধরিয়ে দেওয়া ক্ষতিপূরণের চেক আর মাথার উপর নতুন ফ্ল্যাট আর গাড়ি বাবদ বিপুল ইএমআইয়ের বোঝা নিয়ে ঈশান যখন অফিসের সামনে রাস্তায় এসে দাঁড়াল, তার চোখের সামনে তখন শুধুই অন্ধকার।

আজকের দিনে যে কোনও সময় এমন ঝড় নেমে আসতে পারে যে কোনও সংসারে। আপনার স্বামীর কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, স্বামী চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন, চাকরি চলে যেতে পারে। রঞ্জিনী-ঈশানের সমস্যাটা মাসছয়েেকর মধ্যেই অনেকটা মিটে গিয়েছিল, কিন্তু সবসময় যে দ্রুত পরিস্থিতি আয়ত্তে আসবে তেমনটা না ভাবাই ভালো। মনে রাখবেন এরকম সময়ে আপনার স্বামীর আপনার সমর্থন দরকার। আমরা দিয়ে দিলাম কিছু সাধারণ পথনির্দেশ।

ভয় পাবেন না
সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে আপনার স্বামী নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ একটা সময় কাটাচ্ছেন। এই সময়ে আপনিও যদি টেনশন করতে শুরু করেন, তা হলে লাভ কিছু হবে না। বরং স্বামীকে বোঝান, এই খারাপ দিনগুলো খুব শিগগির কেটে যােব। খুব আতঙ্কিত লাগলে বড়ো শ্বাস নিন, ভাবুন আপনি নিজে এই পরিস্থিতিতে পড়লে স্বামীর কাছ থেকে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করতেন। ওঁকে সাহস দিন, পাশে থাকুন। উনি মনের জোর ফিরে পেলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ােত পারবেন।

খরচপত্রের বাজেট করে নিন
টাকাপয়সার দিকটা হিসেব করে নেওয়া সবার আগে দরকার। কতটা সঞ্চয় আছে দেখুন। আপনি যদি চাকরি করেন, তা হলে আপনার মাসমাইনে দিয়ে কতটুকু চালানো সম্ভব, সেটা হিসেব করে দেখুন। প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ নিন। এই সময় জীবন থেকে সবরকম বিলাসিতা একদম বাদ দিতে হবে। বাইরে খেতে যাওয়া, বেড়াতে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। সংসার খরচও যতটা সম্ভব কমিয়ে আনুন, গাড়ির বদলে বাস-ট্রামের মতো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করুন।’’

টিম হিসেবে কাজ করুন
স্বামীকে মানসিক জোর জোগাবেন তো অবশ্যই, তার সঙ্গে এমন কিছু করুন যাতে উনি আপনার উপর নির্ভর করতে পারেন। ওঁকে নতুন চাকরি খুঁজতেও সাহায্য করতে পারেন। সিভি লিখতে সাহায্য করুন, নিজের নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ওঁর জন্য উপযুক্ত চাকরি খুঁজতে শুরু করুন। আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় না হলে ওঁকে অপছন্দের চাকরি করতে জোর করবেন না, কারণ তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখুন
খুব খারাপ পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখাটা একটা আর্ট। চাকরিটা হারানোর পর ঈশান যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, সে কথা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল রঞ্জিনী। ‘‘পুরো ঘটনাটা শোনার পর আমি প্রথমেই ওকে বোঝালাম, ও একা নয়, এই ব্যাপারটা আমরা দু’জনে মিলে মোকািবলা করব,’’ বলছেন রঞ্জিনী, ‘‘কোনওদিন কোনও তীর্যক মন্তব্য করিনি, বরং ওর উপর যে আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে, সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’’ স্বামীর চাকরি নিেয় আত্মীয়, বন্ধুেদর সঙ্গে আলোচনা করবেন না, তাতে স্বামী বিব্রত বোধ করতে পারেন।

একই বিষয়ে আটকে থাকবেন না
সারাক্ষণ চাকরি নিয়ে আলোচনা করবেন না। নতুন নতুন বিষয় নিেয় গল্প করুন। স্বামীর হাতে এখন অনেকটা বাড়তি সময়। চাকরি খোঁজার সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সময়টা যাতে উনি কোনও সুন্দর হবি গড়ে তোলার কাজে লাগান, সে ব্যাপারে উৎসাহ দিন। তাতে মনমরা হয়ে থাকাটা কমবে, বাড়তি এনার্জি পাবেন।

কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিন
কেরিয়ার নিয়ে যে কোনও সমস্যা আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর্থিক অনিশ্চয়তা যে কোনও সুস্থ সম্পর্ককেও নষ্ট করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। অনেক সময় নিজে নিজে এই জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। যদি দেখেন স্বামী কিছুতেই হতাশা থেকে বেরোতে পারছেন না, বা আপনিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন এবং স্বামীকে সাহায্য করার মতো কিছুই করতে পারছেন না, তা হলে দেরি না করে কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিন। অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সমস্যাটা শেয়ার করলে মন হালকা হয়। কেরিয়ার কাউন্সেলিং করালে অনেক নতুন পথও খুলে যেেত পারে। হতাশ হয়ে পড়বেন না, বরং নতুন করে ভাবার চেষ্টা করুন। খুব শিগগিরই আশার আলো দেখতে পাবেন।
– ফেমিনা

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য