মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহের সময় গ্রেপ্তার রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের আপিল খারিজ করে তাদের সাত বছরের সাজার রায় বহাল রেখেছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।

দুই সাংবাদিককে মুক্তি দিতে আন্তর্জাতিক আহ্বানের মধ্যেই মিয়ানমারের সর্বোচ্চ আদালত সোমবার এই রায় দেয় বলে রায়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়।

তথ্য সংগ্রহের সময় রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন ভাঙার অভিযোগে সাংবাদিক ওয়া লোন (৩২) এবং কিয়াও সো ওকে (২৮) গত বছর সেপ্টেম্বরে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয় ইয়াংগনের জেলা জজ আদালত। পরে হাই কোর্টেও ওই রায় বহাল থাকে।

হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে মিয়ানমারের সপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সো নাইং মঙ্গলবার তার রায়ে বলেন, “আপিল খারিজ করা হল, সাত বছরের সাজার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা বহাল থাকল।”

২০১৬ সালে রয়টার্সে যোগ দেওয়া সাংবাদিক ওয়া লোন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ বিভিন্ন ঘটনার সংবাদ প্রকাশ করেছেন। আর কিয়াও সো ও গতবছর সেপ্টেম্বর থেকে রয়টার্সের প্রতিবেদক হিসাবে কাজ করে আসছিলেন।

ইয়াঙ্গনে পুলিশ কর্মকর্তাদের এক ডিনারের আমন্ত্রণে যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গোপন নথিপত্র ছিল তাদের কাছে।

পরে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ওয়া লোন এবং কিয়াও সো ও রাখাইনের সেনা অভিযানের সময় এক গ্রামে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করে লাশ পুঁতে ফেলার একটি ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানালেও মিয়ানমার সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।

নিম্ন আদালতে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশে বলা হয়, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের অধীনে অভিযোগ এনেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তারা জাতীয় নিরাপত্তাকে হমকির মুখে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্পর্শকাতর তথ্য ও নথি সংগ্রহ করেছেন।

এ মামলায় পুলিশের বক্তব্য ছিল, রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তাদের কাছে সেনাবাহিনীর গতিবিধির বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত নথি পাওয়া যায়। আর মোবাইলে পাওয়া যায় বিভিন্ন মাত্রার গোপনীয় তথ্য।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি। সংবাদ সংগ্রহে বাধা দিতেই ঘটনা সাজিয়ে দুই সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

সাহসী সাংবাদিকতার জন্য ওয়া লোন এবং কিয়াও সো ওকে চলতি মাসের শুরুতে সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পুরস্কার পুলিৎজার দেওয়া হয়।

পশ্চিমা কূটনীতিবিদের কেউ কেউ এবং কোনো কোনো অধিকার সংগঠন দুই সাংবাদিকের এই বিচারকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায় থাকা মিয়ানমারের জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করে সতর্ক করে আসছিলেন। কিন্তু মিয়ানমারের অবস্থান বদলায়নি।

মঙ্গলবার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সাজা বহাল থাকায় আপাতত দুই সাংবাদিকের মুক্তির আর কোনো সুযোগ থাকল না।

রয়টার্সের আইনজীবী দলের প্রধান গাইল গোভ এক বিবৃতিতে বলেন, “ওয়া লোন এবং কিয়াও সো ও কোনো অপরাধ করেননি। তারা অপরাধ করেছেন এমন কোনো প্রমাণও কোথাও নেই। বরং সত্য সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে পুলিশের করা ষড়যন্ত্রের শিকার তারা। তাদের মুক্তির জন্য যা যা করা সম্ভব, তার সব চেষ্টাই আমরা করব।”

এ রায়ের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আদালতে উপস্থিত জাতিসংঘের প্রতিনিধি কুন্ট অস্তাবি রায় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।

“ওয়া লোন এবং কিয়াও সো ওকে মুক্তি দিয়ে তাদের পরিবারের কাছে এবং সাংবাদিকতায় ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিৎ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি সব সময় জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য