আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট থেকে: লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা হাসপাতাল। সাবেক ছিটমহল এলাকার এই হাসপাতালটি স্থানীয়দের কাছে ‘প্রধানমন্ত্রীর হাসপাতাল’ নামে পরিচিত। নির্মাণের আট বছরের মাথায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির মূল গেট বন্ধ। বিকল্প গেট দিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগসহ সব কক্ষে তালা ঝুলছে। ‘প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল’টিতে ডাক্তার-নার্স দূরের কথা, হাসপাতাল দেখভাল করারও কেউ নেই।

হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দুটি টিউবওয়েল, তাও প্রায় ভাঙাচোরা অবস্থা। দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি পড়ে আছে পাশের জঙ্গলে। আর একটি ব্যবহার করে পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চিকিৎসা না পাওয়ায় এলাকার মানুষও এই হাসপাতালে যেতে ইচ্ছুক না।

হাসপাতাল এলাকায় কথা হয় মিজানুর রহমান নামের এক ওয়ার্ড বয়-এর স্ত্রীর সাথে। তিনি জানান, রোগীদের থাকার বেডগুলো কোয়ার্টারে নিয়ে তারা খাট হিসেবে ব্যবহার করছেন। হাসপাতালে এসব জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে বলেই তারা পরিবার নিয়ে ব্যবহার করছেন বলে জানান তিনি।

জানা যায়, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের ২৫ হাজার অধিবাসীর জন্য ১০ শয্যার এই হাসপাতালটি ২০১১ সালে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আরও দুই বার টেলিকনফারেন্সে হাসপাতালটির খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। এই কারণে এলাকাবাসী হাসপাতালটিকে প্রধানমন্ত্রীর হাসপাতাল নামে ডাকেন।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রী এলে ডাক্তার আসেন। মন্ত্রী চলে গেলে ডাক্তাররাও চলে যান। হাসপাতালে ছয় জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না। মাঝে মধ্যে তালা খুললেও রোগীকে প্যারাসিটামল ছাড়া কিছুই দেওয়া হয় না।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, ডা. নাজমুল ইসলাম ও ডা. আহমেদ মোস্তফা নামে দুই চিকিৎসক খাতা কলমে এ হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও বাস্তবে তাদের কোনো সন্ধান নেই। তারা কোথায় আছেন জানেন না সিভিল সার্জনও।

উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের দুইটি পদের একজন কর্মরত থাকলেও বাস্তবে তিনিও অনুপস্থিত। নার্স পদের চার জন নিয়মিত বেতন ভাতা তুললেও বাস্তবে একজনও নেই হাসপাতালে। তবে ১০ শয্যার হিসাব অনুযায়ী সরকারি ওষুধপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়মিত সরবরাহ করা হয়।

দহগ্রামের বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, ‘দহগ্রামের এই হাসপাতাল সারাদিন বন্ধই থাকে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার কোনো কাজে আসছে না।’

কলেজ ছাত্রী মরুফা আক্তার বলেন, ‘প্রাধানমন্ত্রীর হাসপাতালটি বর্তমানে কোনো ধরণের কাজে লাগছে না। ডাক্তার আসলেও কিছুক্ষণ পরিবার নিয়ে এসে ঘোরাঘুরি করে আবার চলে যান।’

লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কাশেম আলী বলেন, ‘বিনাছুটিতে দীর্ঘ আট থেকে নয় বছর অনুপস্থিত থাকা দহগ্রাম হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিষয়ে একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। বাকি জনবল হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন এবং সরকারিভাবে তাদের জন্য ওষুধপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে হাসপাতালে তালা ঝুলে থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তিন বিঘা করিডর খুলে দেওয়া হয়। ফলে মূল ভূখণ্ড থেকে ছিটকে পড়া ছিটমহল আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম যুক্ত হয় বাংলাদেশের সঙ্গে। শুরুতে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পর পর খুলে দেওয়া হতো করিডর গেট। এরপরে ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়।

১৯৮৫ সালে দহগ্রাম একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ২০১১ সালে ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রাম সফরে গিয়ে আজীবনের জন্য করিডোর গেট খুলে রাখার উদ্বোধন করেন। সেদিনই উপহার স্বরূপ দহগ্রামবাসীর স্বাস্থ্য সেবার জন্য হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য