আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালেক্টরেট মাঠে তিন দিনব্যাপী তাবলিগ জামাতের জেলা ইজতেমা আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

শনিবার (৩০ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া আখেরি মোনাজাত শেষ হয় বেলা ১২টার দিকে। মোনাজাত পরিচালনা করেন কাকরাইল মসজিদের জিম্মাদার মাওলানা আশরাফ আলী।

মোনাজাতের আগে বিভিন্ন মেয়াদে তাবলিগের জন্য বের হওয়া জামাতের সাথীদের উদ্দেশ্যে বিশেষ দিক নির্দেশনা তথা হেদায়েতি বয়ানও তিনি পেশ করেন।

৩০মিনিট স্থায়ী আখেরি মোনাজাতের প্রথম ১৫ মিনিট আরবিতে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা, নবী করিম (সা.) এর ওপর দরুদ, কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া সংবলিত আয়াত এবং হাদিসে উল্লিখিত দোয়া ফজিলতপূর্ণ দোয়াগুলো পাঠ করা হয়। মোনাজাত চলাকালে ইজতেমা স্থল ও আশপাশের এলাকায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে ‘আমিন- আমিন’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিরা যার যার চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ফরিয়াদ জানান আল্লাহর দরবারে। বারবার তওবা-ইস্তেগফার করে আত্মশুদ্ধি ও নিজ গোনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব ধরনের বালা-মুসিবত থেকে নিরাপদে থাকার জন্যও প্রার্থনা করা হয়। কামনা করা হয় বিশ্ব উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।

ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে মাওলানা  আশরাফ আলী বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো মার্জনা করুন। উম্মতে মুহাম্মদির পাপরাশি ক্ষমা করে দিন। আমরা পাপিষ্ঠ, আমরা অপরাধী, আমরা ভুলে যাই, আমরা ভুল করি; অনুগ্রহ করে আমাদের সব গোনাহ আপনি ক্ষমা করে দিন। আমাদের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে কবরবাসী প্রত্যেক মুসলমানের গোনাহ মাফ করে দিন।

ও দয়াময় মাওলা! যে কাজের জন্য আপনি আমাদের দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, যে দায়িত্ব দিয়েছেন, আমরা সে সব থেকে গাফেল। মেহেরবানি করে আমাদের গাফলতির পর্দা উঠিয়ে দিন। আমাদের উদাসিনতা দূর করুন।

হে আল্লাহ! উম্মত আজ দাওয়াতের কাজ থেকে দূরে সরে গেছে, জাগতিক মোহ, নফসের পূজা আর প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আপনি সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। জাগতিক মোহ, নফসের পূজা আর প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে রেখে আমাদের মূল জিম্মাদারির সঙ্গে থাকার তওফিক দিন।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঈমানে পরিপূর্ণতা দান করুন। আপনার সমুদয় নির্দেশ আপনার হাবিবের সুন্নত মতে পালন করার তওফিক দিন। রাত-দিন, সকাল-বিকাল, দেশে-বিদেশে, জলে-স্থলে যখন যেখানে আপনার যে হুকুম, তা সঠিকভাবে পালন করার তওফিক দিন।

হে আল্লাহ! আমাদের ঈমান বাড়িয়ে দিন। ঈমানের দাওয়াতের কাজে ঘর থেকে বের হওয়ার তওফিক দিন। ঈমানের জন্য সাহাবায়ে কেরামের মতো যে কোনো ত্যাগ, কষ্ট ও ক্লেশ সহ্য করার ক্ষমতা ও সামর্থ্য দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের দুর্বল ঈমানকে আপনি শক্তিশালী করে দিন। দাওয়াতে তাবলিগের ওপর আপনি ঈমানের মজবুতি রেখেছেন। এ কথা সবাইকে বুঝার ও মানার তওফিক দিন। সুন্নত মতে জীবন গড়ার তওফিক দিন। সুন্নতের দাওয়াত বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার তওফিক দান করুন। বিদয়াত থেকে আমাদেরকে দূরে রাখুন। সুন্নত ও বিদয়াতকে চেনার ও পার্থক্য করার বিবেচনাবোধ দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের দ্বীনের ওপর অটল, অনড় ও অবিচল থাকার যোগ্যতা দিন। হে আল্লাহ! আমরা মুহতাজ, আপনি বে নায়াজ। আমরা পাপী, আপনি ক্ষমাকারী। আমরা উদাসীন, আপনি আমাদের সতর্ক থাকার তওফিক দিন। নামাজের পাবন্দি করার তওফিক দান করুন। জিন্দা নামাজ আদায় করার তওফিক দান করুন। নামাজে খুশ-খুজু দান করুন। জামাতের সঙ্গে তাকবিরে উলারসঙ্গে নামাজ পড়ার তওফিক দিন। আমাদের সব আমল কবুল করুন। ইখলাস দান করুন। অলসতা, বিলাসিতা ও লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে দাওয়াতের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতার বিষয়ে অবগত থাকার তওফিক দান করুন। উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের হেতু সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করুন। দেশ-বিদেশের আনাচে-কানাচে আপনি দ্বীনের কাজ চালু করে দিন। হে আল্লাহ! দ্বীনের দাওয়াতে দেশ-বিদেশে যত জামাত কাজ করছে তাদের হিম্মত বাড়িয়ে দিন। কাজে আগে বাড়ার তওফিক দান করুন। সব বাঁধা ও সমস্যা দূর করে দিন। সবার ভেতর দ্বীনের ফিকির দান করুন। ঐক্যবদ্ধ থাকার তওফিক দিন। আমাদের বিভেদকে মিটিয়ে দিন। আমাদেরকে মনে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে হেফাজতে রাখুন।

হে আল্লাহ! আমরা সবাই হেদায়েতের মুখাপেক্ষি। আমাদেরকে হেদায়েত দান করুন। সঠিক পথের দিশা দিন। হেদায়েতের লাইনে মেহনত করার তওফিক দান করুন।

হে আল্লাহ! পৃথিবীর সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আপনি কবুল করুন। সব মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা ও জামাতকে আপনি কবুল করুন। আলেমদের নেক হায়াত দান করুন। সবাইকে ইখলাসের সঙ্গে দ্বীনের কাজে লেগে থাকার তওফিক দান করুন। হে আল্লাহ! যে সব জামাত আপনার রাস্তায় বেরিয়ে যাচ্ছে, তাদের আপনি জিম্মাদার বনে যান। সকল প্রকার বাধা দূর করে আপনি তাদের সাহায্য করুন। আর যারা আপনার রাস্তায় এখনও বের হতে পারেনি। তাদের দ্রুত আপনার রাস্তায় বের হওয়ার তওফিক দান করুন।

হে আল্লাহ! যারা অসুস্থ তাদের সুস্থতা দান করুন। যারা বিভিন্ন সমস্যায় পতিত তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করে দিন। যারা ঋণগ্রস্ত তাদের ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিন। যারা নিযার্তিত তাদের সহায়তা করুন।

ইয়া হান্নান, ইয়া মান্নান, ইয়া আরহামার রাহিমীন। আপনি পৃথিবীবাসীর ওপর রহম করুন। বেকারদের হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দিন। বিবাহযোগ্যদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন। যারা বিভিন্ন বৈধ বাসনা নিয়ে মোনাজাতে শরিক হয়েছে তাদের সেসব বাসনাগুলোকে আপনি কবুল করুন।

ইয়া আল্লাহ! মেহেরবানি করে আমাদের মোনাজাতকে কবুল করেন। যেভাবে আপনার কাছে চাওয়া দরকার- আমরা সেভাবে চাইতে পারিনি। কিন্তু আপনি অন্তযার্মী, আপনি সবার মনের কথা জানেন-সেটাকেই আপনি কবুল করে নেন।

হে আল্লাহ! এই ইজতেমাকে কবুল করো। যারা ইজতেমার জন্য মেহনত করেছে তাদেরকে কবুল করো। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমাদের। দয়া করে তুমি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমাদের দোয়াকে কবুল করো। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) বাদ ফজর আমবয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তিন দিনব্যাপী লালমনিরহাট জেলা ইজতেমা। শনিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এই জেলা ইজতেমার সমাপ্তি হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য