দিনাজপুর সংবাদাতাঃ দেশের ঐতিহ্যবাহী শস্য ভান্ডার দিনাজপুর জেলার শস্য উৎপাদনে সহায়তার লক্ষ্যে স্বল্প ব্যয়ে সেচ প্রকল্প চালু রাখতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার পুনর্ভবা, ঢেপা, গর্ভেশ্বরী ও আত্রাই নদী খননের জন্য ৪৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের প্রস্তাবনা পানি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়জুর রহমান জানান, চলতি অর্থ বছরে জেলার সদর আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এর সাথে আলোচনা করে জেলার ঐতিহ্যবাহী ৪টি নদীর পানি সংরক্ষণে খননের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

দিনাজপুর শহরের পাশ্বে দিয়ে প্রবাহিত পুনর্ভবা নদী এবং তৎসঙ্গে পাশ্ববর্তী ঢেপা, গর্ভেশ্বরী ও আত্রাই নদী খননের জন্য প্রাথমিকভাবে জরিপ সম্পন্ন করে একটি পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা ফাইল পানি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে গত ২ মাস পূর্বে পরিকল্পনা কমিশনের প্রেরণ করা হয়েছে। ৪টি নদী ১৪২ কিলোমিটার স্থান খনন করতে হবে। এর মধ্যে পুনর্ভবা ৭০ কিলো, ঢেপা ৪০ কিলো, গর্ভেশ্বরী ১৮ কিলো ও আত্রাইয়ের ১৪ কিলোমিটার। খনন কাজে ১৪টি প্যাকেজ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪৭৮ কোটি টাকা।

দিনাজপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নিদর্শন পূনর্ভবানদীগুলো যুগোপযোগী ও আধুনিক মান সম্পন্ন টেকসই পদ্ধতিতে যন্ত্র ব্যবহারে খনন করা হলে পানি সারা বছরই ধারণ ক্ষমতা থাকবে। ফলে এই নদীর পানি জেলার সদর, বিরল, কাহারোল, খানসামা, বোচাগঞ্জ ও চিরিরবন্দর উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমি সেচ কাজে ব্যবহার করা যাবে। নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা হলে ব্যয় স্বল্প হবে এবং ফসলের উৎপাদনও বেড়ে যাবে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলার গাবুড়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সের কৃষক নরেন্দ্র নাথ জানান, দিনাজপুর শহরকে ঘিরে পুনর্ভবা নদী ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু পুনর্ভবা নদীর অবৈধ পার দখল হয়ে যাওয়ায় মাছ ও জলপ্রাণী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ব্যাপক হারে। নদীর প্রাণ ফিরে পেতে প্রথমে দরকার যুগোপযোগী যন্ত্র ব্যবহারে নদীর গভীরতা ফিরে পেতে খনন করা।

নদীতে পানি থাকলেই মাছের সঞ্চালন ফিরে আসবে এবং নদীর পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে। একই কথা বলেন, বিরল উপজেলার কাঞ্চন গ্রামের কৃষিবিদ আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ধান ও সবজি চাষে ব্যাপক সফলতা অর্জন করায় তাকে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, নদীর প্রাণ ফিরে পেতে খননের বিকল্প নেই। খনন করলেই হবে না। বন্যার গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে নদীর ২ তীর আধুনিক প্রযুক্তিতে বাধ দিতে হবে। তবেই বন্যা থেকে রক্ষা এবং নদীর পানি সংরক্ষণ সহজেই করা যাবে। তিনিসহ এলাকার একাধিক কৃষক নদী খননের জন্য সরকারের নিকট জোর আহ্বান জানান।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মনসুর আহমেদ বলেন, নদী বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিবেশ বিপর্যয় মাছ ও জল প্রার্ণী রক্ষা করে নদী ড্রেজিং করা এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হলে আবার ফিরে আসবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাণ চাঞ্চল্য। পুনর্ভবা, ঢেপা, গর্ভেশ্বরী ও আত্রাই নদীকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসবে মূল অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নদী খননের উদ্যোগ গ্রহণ করে নদীর ২ ধারে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এই জেলাতে নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

দিনাজপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নিদর্শন পূনর্ভবাএব্যাপারে পুনর্ভবা নদীর বাঙ্গিবেচা ঘাটের বসবাসরত আলাউদ্দীন, বশির মিয়া, কালু, সতীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ৩০/৪০ বছর পূর্বে এই নদীকে কেন্দ্র করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করতাম। বিশেষ করে মৎস্য চাষ, সেচের পানি, মালামাল পারাপার করে মাঝি মাল্লাদের পেটের ভাত জুটতো এসব কাজ করে। এছাড়াও সেই সময় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই নদী। নদী শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হওয়ায় নদীর মাছের সাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তবে আমরা অবশ্যই চাই পুনর্ভবা নদী স্বরূপে ফিরে আসুক।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান নয়ন জানান, পুনর্ভবা নদীর শেষ সীমানায় গৌরীপুর নামকস্থানে সমন্বিত পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোসহ রেগুলেটর স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের মধ্যে ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে আমরা রোড ব্রিজ, সংযোগ সড়ক ও নদীর তীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করেছি। এসব কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর কৃষকরা মৎস্য চাষ, পশু পালন ও কৃষিতে সেচ কাজের জন্য ব্যাপক লাভবান হবেন। এছাড়াও ৩৬ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। পুনর্ভবা, ঢেপা ও গর্ভেশ্বরী নদী ৫০ কিলোমিটার খননের কাজ প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। অতিশিঘ্রই অনুমোদন পাওয়া যাবে। এসব কাজ সম্পন্ন করা হলে এই অঞ্চলের কৃষকেরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।

এদিকে এলজিইডি দিনাজপুর অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, দিনাজপুরের মোহনপুর ব্রিজে অবস্থিত কাঁকড়া ও আত্রাই নদীতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৫ মিটার রাবার ড্যাম স্থাপন করা হয়। এতে সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার কৃষকের লাভবান হচ্ছেন বেশি। আগে ইরি-বোরো চাষে ১ বিঘা জমিতে সেচ কাজে খরচ পরতো ২ হাজার টাকা। বর্তমানে তা কমে গিয়ে খরচ পড়ে ১২০০ টাকা। পূর্বে ভু-গর্ভস্থে পাম্পের মাধ্যমে পানি উঠিয়ে চাষ কাজ করতো।

দিনাজপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নিদর্শন পূনর্ভবাবর্তমানে রাবার ড্যাম হওয়ায় নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় ললিত পাম্প দিয়ে সেচ কাজ করা হয়। এতে কৃষকদের খরচ অনেকাংশে কমে গিয়েছে। এছাড়াও রাবার ড্যামে পূর্বে নদীর স্তর দিন দিন কমে যাচ্ছিল, তাতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম ছিল। বর্তমানে নদীর পানি উপরের স্তর ঠিক থাকায় অক্সিজেন পর্যাপ্ত থাকে। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কম লাগে। এই রাবার ড্যাম স্থাপন করায় আত্রাই ও কাঁকড়া মরা নদী ২৪ কিলোমিটার জীবন ফিরে পেয়েছে।

এদিকে কৃষক বাতেন, মৎস্য চাষী জামাল উদ্দীন সরকার, ভুট্টো মিয়া ও রফিকের সাথে এ প্রসঙ্গে কথা বললে তারা জানান, রাবার ড্যামের পূর্বে মৎস্য চাষ একেবারে কমে গিয়েছিল। বর্তমানে মৎস্য চাষ বেড়ে গিয়ে জেলেরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। এছাড়া ইরি-বোরো চাষ করতে জমিতে রাসায়নিক সার কম লাগায় তাতে খরচও অনেকাংশ কমে গেছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য