নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও ভোটারদের মাঝে সাড়া ফেলেনি এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমেজহীন হয়ে পরেছে নির্বাচনী পরিবেশ। প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়ালেও ভোটারদের নিরুত্তাপ আচরণে হতাশ তারা।

শহরে প্রার্থীদের পক্ষে মোটর সাইকেল, মাইক্রো শোভাযাত্রা বের হলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই বেশিরভাগ ভোটারদের। শক্ত প্রতিদ্বদ্বি না থাকলেও পচা শামুকে পা কাটার অবস্থা হয়েছে অনেকের। দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মনোনয়ন বঞ্চিত নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বি বিদ্রোহী প্রার্থীরা ফেলছে ঘাড়ে গরম নিশ্বাস।

অনেকে নির্ভার থাকলেও ১০ মার্চ ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ঘটতে পারে অঘটন। তেমনি আভাস দিচ্ছেন ভোটাররাও। অপরদিকে, স্থানীয় সরকার কাগজ কলমে হলেও বাস্তবে প্রতিফলন না থাকায় আসন্ন নির্বাচন তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি অভিমত সুশীল সমাজের। সাধারণ মানুষ যেন সুফল পায় সেক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্ম ক্ষেত্র বন্টনসহ কর্মপরিকল্পনা করার তাগিদ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের। এদিকে নারী ভোটারদের দাবি শুধু ভোটের সময় নয় সারা বছরই যেন নারীদের মুল্যায়ন করা হয়।

কুড়িগ্রাম জেলায় এবার ৯টি উপজেলায় আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হলেও সব দল নির্বাচনে না আসায় দলের ভেতর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৯ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। ফলে অনেকে তাকিয়ে আছেন হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভুত-ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নৌকার কা-ারী হয়েছেন সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু। তার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন জাকের পার্টির গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে মশিউর রহমান ও পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সাইদ হাসান দুলাল। তিনজনেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। মঞ্জুর শক্ত অবস্থান ভেদ করার সুযোগ খুঁজছেন দুলাল। এখানে মঞ্জু ভাল অবস্থানে থাকলেও হাল ছাড়েননি দুলাল। ফলে শেষ হাসিটা কে হাসে তার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকেই।

ফুলবাড়ী উপজেলায় স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান এবার নৌাকর কা-ারী হলেও তার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী সরকার। এখানে শক্তপাল্লা গোলাম রব্বানী সরকার এক চিলতে মাটি ছাড়তে নারাজ। ফলে অঘটন ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

রাজারহাট উপজেলায় নৌকার কা-ারী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নুর মো: আক্তারুজ্জামান। এখানে তার হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বি হচ্ছেন রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক ও চাকিরপশার ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদ সোহরাওয়ার্দী বাপ্পি। দুজনেই সমানে শো-ডাউন করে চলেছেন। শক্তি পরীক্ষার ফলে এখানে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। এখানেও ঘটতে পারে অঘটন।

নাগেশ^রী উপজেলায় নৌকার কা-ারী হয়েছেন রাজনীতিতে নতুন মুখ মোস্তফা জামান। তার প্রতিদ্বন্দ্বি জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে কেএম মহিবুল হক খোকন ও নাগেশ^রী উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি গোলাম রসুল রাজা ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। এখানে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে।

ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় আওয়ামী লীগের নৌকার মাঝি হয়েছেন গতবারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি শোভনের বাবা নুরন্নবী চৌধুরী খোকন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাকের পার্টির আবদুল হাই মাস্টার।

উলিপুর উপজেলায় নৌকার কা-ারী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হোসেন মন্টু। তার প্রতিদ্বন্দ্বি সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও জাতীয় পার্টির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এম কফিল উদ্দিন এবং সাবেক এমপি আমজাদ হোসেন তালুকদারের পূত্র আওয়ামী লীগ নেতা সাজাদুর রহমান তালুকদার সাজু। এই উপজেলাতেও ত্রিমুখী লড়াই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলাফল যে কোন দিকে হেলে যেতে পারে।

চিলমারী থেকে নৌকার কা-ারী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম। প্রভাবশালী এই নেতার কোন প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকলেও শেষ মুহুর্তে কুড়িগ্রাম জেলা থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে ঠিকাদার জোবাইদুল ইসলাম বাদল ও তার স্ত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলিনা বেগম।

রৌমারী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি প্রার্থী হয়েছেন ৬জন। এরমধ্যে নৌকার কা-ারী হয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বঙ্গবাসী। মোটর সাইকেল প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের শেখ আব্দুল্লাহ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন। এছাড়াও লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির নাসির উদ্দিন লাল মিয়া, বিএনপি’র ইমান আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে, এ্সএম মাইদুল ইসলাম (স্বতন্ত্র) আনারস প্রতীক ও আবুল হাশেম (স্বতন্ত্র) কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

রাজিবপুর উপজেলা থেকে নৌকার কা-ারী হয়েছেন শফিউল আলম। তার প্রতিদ্বন্দ্বি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন হিরো।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম সামিউল হক নান্টু জানান, স্থানীয় সরকার কাগজ কলমে হলেও বাস্তবে প্রতিফলন না থাকায় আসন্ন নির্বাচন তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। সাধারণ মানুষ যেন সুফল পায় সেক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্ম ক্ষেত্র বন্টনসহ কর্মপরিকল্পনা করার তাগিদ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু জানান, সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্যই সাধারণ মানুষ নৌকা প্রতীকে ভোট দেবেন বলে বলে উন্মুখ হয়ে আছেন। বিপক্ষ প্রার্থীকে দলছুট আখ্যায়িত করে তিনি বলেন নির্বাচনে এর কোন প্রভাব পড়বে না।

অপরদিকে সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুল হাসান দুলাল জানান, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এই নির্বাচনে ভোটাররা তাদের পছন্দের ব্যক্তিকেই ভোট দেবেন। একই দলের প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনে এর প্রভাব না পড়ার আশা এই প্রার্থীর।

কুড়িগ্রামে ৫টি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাফিজুর রহমান জানান, চলতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ ৯৬জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে চেয়ারম্যান পদে ২৬জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৯ জন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩১জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ১০৪জন।

তিনি জানান, নির্বাচনী পরিবেশ এখনো অনুকূলে রয়েছে। কোথাও কোন সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই কর্মকর্তা স্বীকার করলেন, আচরণবিধি লংঘনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ না পেলেও অনেক প্রার্থীই মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। তবে তিনি বলেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য