দিনাজপুর খাল ও শহর রক্ষা বাঁধে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণদিনাজপুর সংবাদাতাঃ সামান্য বন্যাতেই ডুবেছে দিনাজপুর শহরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এর পেছনে রয়েছে অন্তত তিনটি কারণ নদ-নদী ও খাল খনন না করা, খাল ও শহর রক্ষা বাঁধে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং উঁচু এলাকা দিনাজপুরকে বন্যা ছোঁবে না, এমন ধারণা থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়া। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমনটিই ধারণা করছেন।

দিনাজপুর শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ঘাগরা এবং গিরিজা খাল। ঘাগরা খালটি কাহারোলে শুরু হয়ে পূর্ব দিকের বাস টার্মিনাল হয়ে দিনাজপুর শহরে ঢুকেছে। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গিয়ে পুনর্ভবা নদীতে মিশেছে। আর গির্জা খালটি শহরের কালীতলা থেকে শুরু হয়ে পাটুয়াপাড়া, বালুয়াডাঙ্গা হয়ে কসবা এলাকায় পুনর্ভবা নদীতে গিয়ে মিশেছে। দিনাজপুর পৌরসভা বলছে, গিরিজা খাল প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। ঘাগরা খালও সমসাময়িক। স্বাধীনতার পর থেকে খালগুলো কখনো খনন করা (ড্রেজিং) হয়েছে বলে স্মরণ করতে পারে কেউ।

শহরের সুইহারি, পাটুয়াপাড়া, রামনগর, বালুয়াডাঙ্গা, মুন্সিপাড়া, চুড়িপট্টি, ঘাষিপাড়া, গোলাপবাগ, বড়বন্দর, জোড়াব্রিজ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খালের জায়গা দখল করে বহু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে খালগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবে খাল দখলে কারা জড়িত বা কতজন দখলদার আছে, তার পরিসংখ্যান দিতে পারেনি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।

শহরের খালগুলো দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। খালগুলো সংস্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বহুদিন ধরে তাঁরা দাবি জানিয়ে আসছেন।এলাকা বাসিরা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাই শহরবাসীর আজ এই ভোগান্তি।

নদীগুলো মৃতপ্রায়
দিনাজপুর শহরের তিন দিক দিয়ে বয়ে গেছে তিনটি নদী। পূর্বদিকে আত্রাই, পশ্চিম দিকে পুনর্ভবা এবং উত্তর দিকে ঢেপা। এ তিনটিসহ দিনাজপুরে যে ছোট-বড় ১৯টি নদী রয়েছে, তার বেশির ভাগই এখন মৃতপ্রায়। কারণ, কোনো নদীই কখনো খননের মুখ দেখেনি। ফলে ধারণ ক্ষমতা কমেছে। পানি বাড়ামাত্র তা উপচে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে দিনাজপুর শহরের পূর্বদিকে চাঁটগাও থেকে কাউগা পর্যন্ত সাড়ে ১২ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। পশ্চিম দিকে গোসাইপুর থেকে ঘুঘুডাঙ্গা পর্যন্ত রয়েছে সাড়ে ১৫ কিলোমিটার বাঁধ। এ বাঁধ দুটি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয়। চাতরাপাড়া, বাঙ্গিবেচা, খামার ঝাড়বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের দুই ধারেই দখলের ছড়াছড়ি। ঢালু কেটে সমান করে বিভিন্ন স্থাপনা করা হয়েছে। পাউবো কর্তৃপক্ষের হিসাবেই এ দুই বাঁধে ৫৫১ জন দখলদার রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করায় বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ফলে সামান্য বন্যায় ঢুকেছে পানি, ভেঙেছে বাঁধ। ডুবেছে দিনাজপুর।

দিনাজপুর পাউবোর সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মনসুর আলী বলেন, শহরে জলাবদ্ধতার জন্য দখল অন্যতম কারণ। দুটি শহর রক্ষা বাঁধে ৫৫১ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। দখলদার উচ্ছেদে বারবার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। বেশ কয়েকবার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়াও হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে আবার বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই অবৈধ দখলের কারণেই আজ সামান্য বন্যায় ডুবছে দিনাজপুর শহরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। তবে শুধু নদী-খাল নয়, খোলা জমিসহ মাঠঘাট দিয়েও পানি নিষ্কাশন হয়। আইন না মেনে যত্রতত্র স্থাপনা-কলকারখানা করায় বন্ধ হচ্ছে পানিপ্রবাহের পথ। তার খেসারত দিতে হচ্ছে সবাইকে।

দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, খালগুলো দখলমুক্ত এবং ড্রেজিং করা থাকলে শহর বন্যায় ডুবত না। কারণ, তিনি পৌরসভার নিজস্ব এবং এডিবির তহবিলে গত বছর বালুয়াডাঙ্গা এলাকায় গিরিজা খালের দেড় কিলোমিটার ড্রেজিং করেন। এবারের বন্যায় ওই এলাকা ডোবেনি। তিনি বলছেন, গিরিজা ও ঘাগরা খাল সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকবার প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছিল। তাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টিও রয়েছে। প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখলে আজ এ সমস্যা হতো না।

জেলা জাসদের সভাপতি আইনজীবী লিয়াকত আলী বলেন, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় দিনাজপুরে খাল ও বাঁধ দখল হয়েছে। এখন দিনাজপুরবাসী যে সমস্যায় পতিত, তার দায় ক্ষমতাসীনদেরই। পাশাপাশি এবারের বন্যার পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু দিনাজপুরের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জনসাধারণকে এ বিষয়ে সতর্ক করেনি, যার কারণে ভোগান্তি বেড়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য