খাজা নাজিমুদ্দিনঅ-বিভক্ত বাংলার মূখ্য মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন বাঙালি। কিন্তু বাংলা জানতেন না। বাংলায় কথা বলতে পারতেন না। শুধু তাই নয়। মনোগতভাবেই তিনি বাংলা বিরোধী ছিলেন। যখন কায়েদে আযম ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু, আর বাংলার দামাল ছেলেরা নো নো বলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তখন নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর পক্ষে ছিলেন। যখন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সারা দেশে আন্দোলন চলছে, রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছে তখনো খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে। তিনি বাংলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, জনগণ উর্দুই চায়!

এই রকম একজন বির্তকিত, সুবিধাবাদী ও বাংলা বিদ্ধেষী রাজনীতিকের নামে দিনাজপুর জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারের নাম ‘খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরি!’ বিষয়টি অবাক করার মতই। লজ্জারও। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের রক্তের ভেতর দিয়ে এই নাম আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে ৮১ বছর ধরে।

আশ্চর্যজনক বলছি কারণ মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ জীবনের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর এই নাম টিকে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু এখনো টিকে আছে! কেন? এর সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া মুশকিল। আমার দূর্ভাগ্য যে, আমি এখন এই পাঠাগার পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। আর আমার মধ্যে খোঁচা দিচ্ছে এই নাম। আমার প্রশ্ন, বাংলা ভাষা বিরোধী একজন মানুষের নামে, যার কি না এই পাঠাগার সৃষ্টির পেছনে কোন অবদান নেই, কেন, কি কারণে এই পাঠাগারের নাম তার নামে থাকবে?

শহরের মুন্সীপাড়ায় এই লাইব্রেরির নিজস্ব ভবন, কার্যালয়, পাঠাগার রয়েছে। এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৩১ সালের ৩ জুন। তখন এর নাম ছিল ‘মুসলিম মঙ্গল পাঠাগার।’ দিনাজপুর শহরের লালবাগ মহল্লায় এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৎকালিন সময়ের একজন অগ্রসর ব্যক্তিত্ব, শিক্ষানুরাগী, জ্ঞান অনুসন্ধিচ্ছু মোহাম্মদ হেমায়েত আলী।

প্রাথমিক অবস্থায় একটি জীর্ণ-শীর্ণ ঘরে মুসলিম মঙ্গল পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এর সম্প্রসারণ ও শ্রীবৃদ্ধিতে সর্বদা সচ্ষ্টে ছিলেন হেমায়েত আলী। নিজের অর্থ ব্যয় করে বই কিনেছেন পাঠাগারের জন্য। শ্রম দিয়েছেন অক্লান্ত। লাইব্রেরির উন্নয়নে এতই সময় দিয়েছেন, এত অর্থ ব্যয় করেছেন যে, নিজের সংসারের প্রতিও এত মনোযোগি ছিলেন না কখনো।

ব্যক্তি জীবনে ধার্মিক, কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতেন হেমায়েত আলী। সেই সময়ের বিখ্যাত পাঠাগার আর্য পুস্তকাগারে বই পড়ার জন্য যেতেন। কিন্তু তখন ঐ পাঠাগারের বেশিরভাগ পাঠক ছিলেন বর্ণবাদে বিশ^াসী উচ্চ বর্ণের মানুষেরা। একদিন সেই উচ্চ বর্ণের মানুষদের দু-একজন মুসলমান হওয়ার কারণে হেমায়েত আলীকে আপত্তিকর মন্তব্য করলে তিনি মনোক্ষুন্ন হন এবং উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের জন্য একটি পাঠাগার থাকা দরকার। সেই বোধ থেকেই মুসলিম মঙ্গল পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু ঐ পাঠাগারে মুসলিম, হিন্দুসহ সকল ধর্মের মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল, এখনো আছে। কারণ তিনি পাঠাগার করেছিলেন হিন্দু, মুসলিম সকলের জন্য, মানুষের জ্ঞান অন্বেষনের জন্য।

হেমায়েত আলী ১৯৩৩ সালে দিনাজপুর শহরের মুন্সীপাড়ায় মুসলিম মঙ্গল পাঠাগারটি স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কারণ এই জায়গাটি ছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে। অপরদিকে লালবাগের অবস্থান শহরের প্রান্তিক এলাকায়। কিছু নিজের জায়গা কিছু শ^শুরের (বদিউজ্জান, দিনাজপুর জেলা জজকোর্টের তৎকালিন সেরেস্তাদার) জায়গা নিয়ে হেমায়েত আলী মুন্সীপাড়া মহল্লায় লাইব্রেরির নতুন ও নিজস্ব ভবন নির্মাণের আয়োজন করেন।

১৯৩৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালিন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন দিনাজপুরে আসেন। হেমায়েত আলী তার সাথে দেখা করেন এবং মুসলিম মঙ্গল পাঠাগারটির নাম খাজা নাজিমুদ্দিন এর নামে করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। শিক্ষামন্ত্রী অনুমতি দিলে পরদিন মুন্সীপাড়ায় ‘খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরি’র ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন খাজা নাজিমুদ্দিন। -(মোহাম্দ হেমায়েত আলী জীবন ও কর্ম, মু. আব্দুল জব্বার, পৃষ্ঠা-৬১) প্রশ্ন হলো হেমায়েত আলী নিজের ও শ^শুরের জায়গার উপর যে লাইব্রেরির ভিত্তি দিলেন কেন তার নাম বদল করে খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে রাখলেন? এর কারণ হিসেবে হেমায়েত আলীর পুত্র এবং বিশিষ্ট লেখক জুলফিকার আলী (টেলিফোন আলাপে) জানান যে, তার পিতা (হেমায়েত আলী) পাঠাগারটির স্থায়ী রুপ দিতে যে কোন ভাবেই বদ্ধ পরিকর ছিলেন। একটি পাঠাগার নির্মাণ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। তখনকার প্রেক্ষাপটে এত বিপুল অর্থের সংস্থান করা কঠিন বিষয় ছিল। তার ধারণা হয়েছিল, খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে পাঠাগারটি হলে তিনি মন্ত্রী হিসেবে সরকারি সহায়তা দেবেন, ফলে ভবন নির্মাণে বেগ পেতে হবে না।

নাম বদলের বিষয় নিয়ে তখন অনেকে হেমায়েত আলীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, ‘খাজা নাজিমুদ্দিনের ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল সাপোর্ট পাব বলেই তার নামে এই হলের নাম রেখেছি। -(মোহাম্মদ হেমায়েত আলী জীবন ও কর্ম, মু. আব্দুল জব্বার, পৃষ্ঠা-৬৪) কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, খাজা নাজিমুদ্দিন ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের দিন ব্যক্তিগতভাবে ২৫০ টাকা অনুদান দিলেও পরবর্তীতে নিজের পক্ষ হতে কিংবা সরকারিভাবে আর কোন অর্থ এই লাইব্রেরিতে দেন নাই। সেই সময় লাইব্রেরি ভবন নির্মানে একটি তহবিল গঠণ করা হয়েছিল। সেই তহবিলে খাজা নাজিমুদ্দিন ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে ২৫০ টাকা, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ২৫০ টাকা ও পীরগঞ্জের সূর্যপুর নিবাসী মুন্সী কামালউদ্দিন সরকার ৪০০ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আরো অনেকে সহযোগিতা করলেও খাজা নাজিমুদ্দিন সহযোগিতা করেছেন বলে জানা যায়নি। বরং বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন, এমন আশংকা থেকে তার নামে প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরির জন্য কোন বরাদ্দ কখনো দেন নাই। অর্থাৎ যে লক্ষ্য নিয়ে হেমায়েত আলী তৎকালীন সময়ের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নামে লাইব্রেরির নাম বদলে দিলেন, সেই লক্ষ্য কখনোই সফল হয় নাই।

তদুপরি পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা নিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনের বিতর্কিত ভূমিকায় দিনাজপুরে তার নামে লাইব্রেরিটির নাকরণকে প্রশ্নবোধক করে তোলে। এখন অনেকেই মনে করেন যে, এই লাইব্রেরিটির নাম আবারো বদলানো দরকার। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, দিনাজপুর এর সাধারণ সম্পাদক সুলতান কামালউদ্দিন বাচ্চু মনে করেন, যিনি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ছুরিকাঘাত করেছেন তার নামে স্বাধীন বাংলায় কোন প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা উচিৎ নয়।

এখন আামরা দেখি যে, খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কি কি করেছিলেন। বাঙালিকে কিভাবে দমানোর চেস্টাা করেছিলেন।

উইকিপিডিয়ার তথ্য হলো: ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। তার সময়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মাতৃ ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলনরত মিছিলে গুলি চালানো হয় এবং রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেক ছাত্র-যুবককে হত্যা করা হয়।

বাংলাপিডিয়া লিখেছে : ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাািকস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার গভর্ণর জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হন। রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন হওয়ায় প্রগতিশীল নেতা-কর্মীদের সাথে মিশতে পারতেন না। তার মাতৃভাষা ছিল উর্দু এবং বাংলা ভাষা ভাল জানতেন না। ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টা চালাবেন বলে সংগ্রাম পরিষদের সাথে চুক্তি করলেও পরে সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করেন নি। উল্টো ১৯৫২ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে সমালোচিত ও নিন্দিত হন।

খাজা নাজিমুদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের সাথে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে চেস্টা চালাবেন বলে চুক্তি করলেও তিনি কখনো সেই চেস্টা চালান নাই, বরং বাঙালি জাতির সাথে বিশ^াসঘাতকতা করে উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তৎপর ছিলেন। বাঙালির মাতৃভাষার বিষয়ে ১৯৪৮ সালে নেতিবাচক ছিলেন, ১৯৫২ সালেও নেতিবাচক ছিলেন। ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত সকল বই-পুস্তকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার নেতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ আছে। তার তখনকার ভূমিকা থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, যদি তিনি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি ইয়াহিয়া, মোনায়েম খান, টিক্কা খান, গোলাম আযম, সবুর খানদের মতই হায়েনা রুপ ধারণ করতেন। অথচ তার নামেই কি না দিনাজপুরের বিখ্যাত লাইব্রেরিটির নামকরণ রয়ে গেছে স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও। এটা ভীষণ এক লজ্জা ও কলংকের ব্যাপার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার জন্য এই নাম অসন্মানজনক। এই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়াই হবে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের জন্য মর্যাদার।

দিনাজপুরের খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরির পরিচিতি আছে সারা দেশে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও এই লাইব্রেরির পরিচিতি কম নয়। খাজা নাজিমুদ্দিনের কারণে নয়, লাইব্রেরিটির সংগ্রহশালার করাণে এই পরিচিতি গড়ে উঠেছে। এখানে বই আছে প্রায় ৪৫ হাজার। এর মধ্যে প্রাচীন ও দূর্লভ গ্রন্থের সংখ্যা ১০ হাজারের কম না। এখানে হাতে লেখা ৩টি কোরাণ শরিফ আছে। এর সাথে আছে সকল ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ সমূহ। এখানে সংগ্রহে আছে প্রায় ৫শত প্রাচীন পুঁথি যা বাংলাদেশের খুব কম পাঠাগারেই পাওয়া যায়। এইসব পুঁথির কোনটারই বয়স তিন শত বছরের কম নয়। বাংলাদেশের এক সময়ের বিখ্যাত কবি হায়াত মামুদের জঙ্গনামা কাব্য গ্রন্থের মাত্র ২টি কপি সারাদেশে সংরক্ষিত আছে বলে শোনা যায়। এর মধ্যে একটি আছে এই লাইব্রেরিতে। এই লাইব্রেরির তত্বাবধানে একটি যাদুঘর পরিচলিত হয়, যার নাম দিনাজপুর মিউজিয়াম। এই মিউজয়ামের অধিকাংশ সংগ্রহ জাতীয় যাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। এখনো এখানে যে সকল প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে সেগুলোর মধ্যেই যুক্ত আছে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস। এইসব কারণেই দিনাজপুরের পাবলিক লাইব্রেরিটির পরিচিতি ছড়িয়েছে দেশে ও বিদেশে।

-আজহারুল আজাদ জুয়েল
সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক
সাং- পাটুয়াপাড়া, জেলা/পোস্ট- দিনাজপুর

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য