ভেনেজুয়েলায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দাবিভেনেজুয়েলায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুইদোর সমর্থকরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বুধবার (৩০ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলার সরকারবিরোধী চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও অন্য কর্মীরাও বড় বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ করেছে।

গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি নিজেকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন দেশটির বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো। বিরোধী নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পরিষদ মাদুরোকে দ্বিতীয় মেয়াদে ‘অবৈধ ঘোষণা’র পরই ওই পদক্ষেপ নেন হুয়ান।

কয়েক মিনিটের মাথায় তাকে ‘স্বীকৃতি’ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পরই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়ে কূটনীতিকদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসার নির্দেশ দেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো। সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ’র বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুইদোর সমর্থকরা পতাকা ও ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। এদিন রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। শহরের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা আলতামিরাতেও বিক্ষোভ হয়েছে।

আনা বেলো নামের ৪৭ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী পতাকা ওড়াতে ওড়াতে আল জাজিরাকে বলেন, ‘এতো বেশি দৈন্য দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত। ওষুধ পাচ্ছি না, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে খাবার খুঁজতে খুঁতে দিন পার হয়ে যাচ্ছে।’ অফিস সেক্রেটারি বেলো মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে বিক্ষোভে যোগ দেন।

শহরের প্রাণকেন্দ্র লা কান্ডেলারিয়া থেকে বিক্ষোভকারীরা মিছিল করতে করতে জেএম দে লস রিওস হাসপাতালে পৌঁছান। ওই হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স বিক্ষোভে যোগ দেন। নার্স মারিয়া আলভারেজ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। এমনকি আমাদের পরিচালকরাও বলেছেন এর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমরাতো জানি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের অভাবে রোগীদের মারা যেতে দেখাটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক।’

স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট গুইদো বৃহস্পতিবার ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির হাসপাতালের সামনে এক বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে স্লোগান দিচ্ছিলো, ‘গুইদো এখানে আছেন, গুইদো তার সঙ্গে করে আমাদের ভরসাকেও নিয়ে এসেছেন।’

সমাবেশে গুইদো বলেন, ‘আমরা ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্দশা ঘুচাতে পারব।’ নতুন করে আবারও দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সমর্থন চেয়েছেন তিনি। বুধবার (৩০ জানুয়ারি) হুয়ান গুইদো’র দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির সুপ্রিম ট্রাইব্যুনাল অব জাস্টিস। একইসঙ্গে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়।

এদিকে মাদুরো অভিযোগ করে আসছেন, বিরোধীরা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করছে। মাদুরোর দাবি, তাকে উৎখাতের জন্য অর্থনৈতিক যুদ্ধে মেতেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার এক ভিডিও বার্তায় মাদুরো ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে সমর্থন না দিতে আমেরিকানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর একদিন আগে রুশ বার্তা সংস্থা আরআইএ নোভোস্তিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাদুরো জানান, ‘ভেনেজুয়েলার শান্তি ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে’ তিনি গুইদোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন।

সরকারবিরোধীরা বিক্ষোভ চালিয়ে গেলেও ভেনেজুয়েলার অনেক এলাকার বাসিন্দারা তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করেছেন। কারাকাসের পার্শ্ববর্তী এলাকায় দিয়াশলাই ও সিগারেট বিক্রি করেন আনা গনজালেস। তিনি বলেন, ‘কঠিন সময় যাচ্ছে। তবে কাজ বন্ধ রেখে আলতামিরায় গিয়ে দুই ঘণ্টা ধরে স্লোগান দেওয়ার মতো সময় আমার হাতে নেই।’ গনজালেস মাদুরোর বিরোধী কিনা কিংবা গুইদোকে নিয়ে তিনি কী ভাবেন সে ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি। শুধু জানিয়েছেন, তার ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। গনজালেস জানান, মানুষের কাছে পুরো এক প্যাকেট সিগারেট কেনার মতো টাকা এখন থাকে না। একটি করে সিগারেট বিক্রি করতে পারেন তিনি।

সম্প্রতি সুবিখ্যাত মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও মানবতার পক্ষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি’র প্রফেসর এমিরিটাস নোম চমস্কিসহ ৭০ জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক খোলা চিঠিতে তারা বলেছেন,যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভেনেজুয়েলাকে সংকটের চূড়ায় ঠেলে দিয়েছে। হুয়ান গুইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সুস্পষ্টভাবে ভেনেজুয়েলার সংকটকে তীব্র করেছে। তারা ভেনেজুয়েলা সেনাবাহিনীকে বিভক্ত ও জনগণের মেরুকরণকে আরও তীব্র করতে কোনও একটি পক্ষকে বেছে নিতে বাধ্য করছে। এর সুস্পষ্ট লক্ষ্য হলো নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য