জাতিসংঘ কর্মকর্তার রাখাইন সফরে মিয়ানমারের বাধানিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কারণ দেখিয়ে রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডির নির্ধারিত সফর স্থগিত করেছে মিয়ানমার। সোমবার (১৪ জানুয়ারি) জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। রাখাইনে সেনা-বিদ্রোহী সংঘাত জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত জানানো হলেও নিরাপত্তা পরিষদের একজন কূটনীতিক একে অজুহাত হিসেবেই দেখছেন। তার মতে, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনে তাদের নিষ্পৃহ ভূমিকা আড়াল করতেই এমনটা করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। গত ৪ জানুয়ারি রাখাইনে সীমান্ত চৌকিতে আরাকান আর্মির সদস্যদের হামলায় ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকে ওই এলাকার পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত রয়েছে। প্রায়শই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষ চলছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার(ইউএনএইচসিআর) হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডির রাখাইন সফরের কথা থাকলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সে সফর বাতিল করেছে।

ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেসিক বলেন, ‘রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়নের ভিত্তিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ সফর স্থগিত করেছে।’ কূটনীতিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানিয়েছে, রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের বিষয়টি এ সপ্তাহের শেষের দিকে নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপন করবে ব্রিটেন।

সংঘাতের কারণে মিয়ানমারে জাতিসংঘের দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনারের রাখাইন সফর নিয়ে এরইমধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় গ্রান্ডির সফর স্থগিতের ঘটনায় সংশয় জোরালো হচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে। এতে মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের ইঙ্গিত পাচ্ছেন নিরাপত্তা পরিষদের একজন কূটনীতিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনে ‘তারা [মিয়ানমার] কোনও ভূমিকা নেয়নি’। তার মতে, কোনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ঘটনা আড়াল করতেই জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সফরে স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘে নিয়োজিত মিয়ানমার মিশনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে এএফপি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পায়নি।

ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল ব্রিটেন। ওই প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের জন্য একটি কৌশল নির্ধারণ করতে একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে চীন ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তুমুল আপত্তি তুলেছিল। আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল দেশটি।

উল্লেখ্য, ২০১২ ও ২০১৭ সালে দুই দফায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যার শিকার হয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বাকিদের রাখাইন থেকে তাড়াতে বিভিন্ন ধারার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। সমগ্র আন্তর্জাতিক দুনিয়া যেখানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে, মিয়ানমার সেখানে ওই জনগোষ্ঠীর মানুষকেও ‘বাংলাদেশের নাগরিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য