বার্থকন্ট্রোল সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্যবার্থকন্ট্রোল বলতে কী বোঝায়?
সোজা কথায়, অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক আর গর্ভাধানের মাঝের দেওয়ালটাই হচ্ছে কনট্রাসেপটিভ বা বার্থকন্ট্রোল। আজকাল বাজারে নানা ধরনের বার্থকন্ট্রোল মেলে। তার মধ্যে ওরাল কনট্রাসেপটিভ পিল আর কন্ডোম আছে, আছে ইনট্রাইউটেরাইন ডিভাইস, ভ্যাজাইনাল রিং এবং হরমোনের ইঞ্জেকশন। কন্ডোমের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ লাগে না, কিন্তু অন্য প্রতিটি ব্যবহারের আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সঙ্গে একবার কথা বলে নিতে ভুলবেন না। কারণ প্রতিটিতেই নানা মাত্রায় হরমোন থাকে, কোনটা আপনার শরীরের পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ হবে তা জানা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। যাঁদের হাইপারটেনশন বা ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের তো অতি অবশ্যই পিল ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কত দিন বার্থকন্ট্রোলের উপর নির্ভর করা যায়?
সেই অর্থে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। যতদিন পর্যন্ত সন্তানের পরিকল্পনা নেই, ততদিন ব্যবহার করতে পারেন। ‘‘তবে মনে রাখবেন, কোনও কনট্রাসেপশনই কিন্তু 100 শতাংশ সুরক্ষার গ্যারান্টি দেয় না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কিছু সাইড এফেক্টসও থাকে। তবে এ কথা ঠিক যে কনট্রাসেপটিভ পিল ব্যবহার করা সবচেয়ে সহজ। এর সাফল্যের হারও ভালোই। ভ্যাজাইনাল রিং বা কন্ডোম যাঁরা প্রথমবার ব্যবহার করছেন, তাঁদের কিছু সমস্যা হতে পারে, তবে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে ভালোই কাজ দেয়। যাঁরা তিন থেকে পাঁচ বছর গর্ভাধান পিছিয়ে দিতে চান, সেই সব দম্পতির জন্য আদর্শ। তবে শরীরে প্রবেশ করানোর জন্য ছোট একটি প্রসিডিওর করানো হয়। অবিবাহিত মহিলাদের আমি সাধারণত এই পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিই না,’’ বলছেন হাওড়ার নারায়ণা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনিকোলজিস্ট ডা. সুমনা দত্ত। আজকাল এমন অনেক দম্পতিও আছেন, যাঁরা একেবারেই সন্তান চান না। তাঁদের দীর্ঘকালীন বার্থকন্ট্রোলের আশ্রয় নিতে হয়। সিকে বিড়লা হসপিটালস সিএমআরআই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ অবস্টেট্রিশিয়ান ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জরী চ্যাটার্জির পরামর্শ, পছন্দসই কোনও কনট্রাসেপটিভ বেছে নিতে হবে এবং অতি অবশ্যই মেডিক্যাল সুপারভিশনে থাকতে হবে। বলছেন, ‘‘আজকাল খুব ভালো ওষুধপত্র বেরিয়ে গিয়েছে, তাই সাইড এফেক্টের ভয় পাবেন না। কিন্তু সবাইকেই আমরা বছরে অন্তত একবার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে নেওয়ার পরামর্শ দিই। কোথাও কোনও সমস্যা হলেই সেক্ষেত্রে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’’

বার্থকন্ট্রোল নিয়ে আমাদের সমাজ কতটা মুক্তমনা?
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইন্দ্রাণী লোধ মেনে নিচ্ছেন যে, আমাদের সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন, এখনও পর্যন্ত বার্থকন্ট্রোল নিয়ে পরিষ্কার করে কোনও আলোচনা চালানো নিয়ে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। তিনি বলছেন, ‘‘মানসিকভাবে আমরা হয়তো অনেকটাই এগিয়েছি, কিন্তু এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ মা-বাবাই এটা মেনে নিতে পারেন না যে তাঁদের সন্তানদের, বিশেষ করে অবিবাহিত সন্তানদের বার্থকন্ট্রোলের প্রয়োজন থাকতে পারে। আর সেই কারণেই মুড়ি-মুড়কির মতো এমার্জেন্সি কনট্রাসেপটিভ পিলের ব্যবহার হয়। তার ফলে অজস্র সমস্যা বাড়ছে। সমাজের এ বিষয়গুলো নিয়ে এখনই সচেতন হওয়া উচিত এবং প্রচার শুরু হওয়া উচিত একেবারে স্কুল স্তর থেকে,’’ বলছেন তিনি।

এমার্জেন্সি কনট্রাসেপটিভ পিল থেকে কী কী সমস্যা হতে পারে?
কনট্রাসেপশন বা বার্থকন্ট্রোল এমন একটা পদ্ধতি যা নিয়ে যৌন সম্পর্কের আগেই চিন্তাভাবনা করা উচিত, পরে নয়। এমার্জেন্সি কনট্রাসেপশন নিয়ে কিছু বছর হল আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অল্পবয়সি মেয়েরা ধরেই নিয়েছেন যে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পর একটি ওষুধ খেয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। ধারণাটি সর্বৈব ভুল। ডা. লোধ বলছেন, ‘‘এমার্জেন্সি কনট্রাসেপশনের মূল উপাদান হচ্ছে প্রজেস্টেরনের হাই ডোজ়। ওষুধ খাওয়ার পর শরীরে হরমোনের ব্যালান্সে অসাম্য আসে। ফলে তিন-চারদিন পর একটা ব্লিডিং হয়। তার পর অনেকের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক চক্রটা শুরু হতে সময় লাগে। অনেকে আবার একটি ঋতুচক্রের মধ্যে একাধিক এমার্জেন্সি পিল খেয়ে নেন। তাতে আরও সমস্যা বাড়ে। ইন ফ্যাক্ট, বেড়াতে যাওয়া, বিয়েবাড়ি, পুজো ইত্যাদি কারণে পিরিয়ড পিছিয়ে দেওয়ার জন্যও অনেকে ওষুধপত্র খান, সেটাও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণ হতে পারে।’’

বিয়ের আগে গাইনিকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়ার দরকার আছে?
ওরাল কনট্রাসেপটিভ পিল জাস্ট দোকানে গিয়ে কিনে খেতে শুরু না করারই পরামর্শ দেন অধিকাংশ ডাক্তার। ডা. দত্ত বলছেন, ‘‘যাঁরা বিয়ের প্ল্যানিং করছেন, তাঁরা একবার বিয়ের আগেই গাইনিকোলজিস্টের কাছে কাউন্সেলিংয়ে যান। বিয়ের ঠিক আগেই যে ঋতুস্রাব হবে, সেই সময় থেকেই পিল চালু করুন। রাতারাতি ওষুধ খেলেই প্রার্থিত ফল পাওয়ার আশা করবেন না। প্রথমবার কনট্রাসেপটিভ খেলে কিছু কিছু সমস্যা হতে পারে। যেমন গা বমিভাব, অল্প স্পটিং ইত্যাদি। তার পর ব্যবহার করতে করতে বিষয়টা সহজ হয়ে আসে ক্রমশ।’’ তাছাড়া আমরা এমন একটি জনজাতি যাদের মধ্যে অজস্র থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার লুকিয়ে আছে, তাই অতি অবশ্যই বিয়ের আগে কিছু নির্ণায়ক রক্তপরীক্ষা করিয়ে নেওয়া আবশ্যক। সে সবের জন্যও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে কোন কনট্রাসেপটিভ আদর্শ?
কোনও ছুঁৎমার্গ না রেখে এ কথা মেনে নেওয়া ভালো যে আমাদের সমাজে এখন প্রচুর সিঙ্গল মহিলা ও পুরুষ আছেন এবং তাঁদের অনেকেই কোনও সম্পর্কে না থেকেও নিয়মিত যৌন জীবন বজায় রাখতে আগ্রহী। ‘‘এঁদের ক্ষেত্রে আমি ব্যারিয়ার মেথড আর ওরাল পিল দু’টি একসঙ্গে ব্যবহারের পরামর্শ দেবো। নিরাপদ যৌনতার কোনও বিকল্প নেই। গর্ভাধান আটকানোর পাশাপাশি এসটিআই বা সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ইনফেকশন থেকেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে পুরুষসঙ্গীর কন্ডোম ব্যবহার আবশ্যক,’’ বলছেন ডা. মঞ্জরী চ্যাটার্জি।

কোন বয়স থেকে একটি মেয়ে বা ছেলের বার্থকন্ট্রোল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হওয়া উচিত?
এ কথা অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই যে যুগ বদলাচ্ছে এবং তারই হাওয়া এসে লাগছে পুরো সমাজব্যবস্থার গায়ে। অধিকাংশ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞই মেনে নেন যে আজও বেশিরভাগ মা-বাবাই মানতে পারেন না যে কিশোর বয়স থেকেই তাঁদের সন্তানের যৌন চেতনা পূর্ণ মাত্রায় জেগে ওঠে। তাই স্কুল স্তরেই কাউন্সেলিং শুরু হওয়া উচিত। ডা. লোধ বলছেন, ‘‘টিনএজ প্রেগন্যান্সি ঠেকাতে চাইলে ইচ্ছুক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজ, পরিবারকে হাত মিলিয়ে চলতে হবে। নিয়মিত আলাপচারিতা চালাতে হবে।’’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য