স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ আপনার জন্যকতটা জরুরীনিয়মিত যাঁরা ব্যায়াম করেন, তাঁদের মধ্যেও এমন অনেকেই আছেন যাঁরা স্ট্রেচিংকে তত গুরুত্ব দেন না৷ স্ট্রেচিং করার প্রয়োজনীতা আদৌ আছে কী? যোগ প্রশিক্ষক মনীষা দাস বলছেন, ‘‘অবশ্যই আছে৷ স্ট্রেচিং আপনার মাসলগুলির স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে৷ ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ায়৷ নিয়মিত যাঁরা স্ট্রেচিং অভ্যেস করেন, তাঁদের ইনজুরি কম হয়৷ আজকাল বেশিরভাগ পেশাদারই দীর্ঘ সময় সিটে বসে কাজ করেন, নড়াচড়া করার সুযোগই পান না সেই অর্থে৷ স্ট্রেচিং এঁদের জন্য একেবারে আদর্শ৷ মাসলের ফ্লেক্সিবিলিটি বজায় রাখতেও সাহায্য করে স্ট্রেচিং৷ দেখবেন, যে কোনও স্পোর্টস তারকার ফিটনেস রুটিনের অনেকটা জুড়ে থাকে স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ়৷ যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদেরও এক্সারসাইজ় শুরুর আগে ও পরের বেশ খানিকটা সময় মাসল স্ট্রেচিংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত, তাতে আরামও পাবেন৷’’

মাসল রিল্যাক্স করতে সাহা়য্য করে স্ট্রেচিংঃ
স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ় শুরু করলে বুঝতে পারবেন যে এর ফলে আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিতে রক্ত চলাচলের হার বাড়ছে, ফলে পুরো ওয়ার্কআউট সেশনটা আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন৷ ব্যায়ামের শেষে স্ট্রেচ করলে ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করবে না, ঝরঝরে লাগবে৷ তাই যাঁরা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাঁরাও স্ট্রেচিং প্র্যাকটিস করার ব্যাপারে যত্নশীল হোন৷ যোগে খুব ভালো কিছু স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ় আছে৷ সূর্য নমস্কার অভ্যেস করলেই দুর্দান্ত স্ট্রেচিং হয়৷ মনীষা বলছেন, ‘‘এভাবেও বলতে পারেন যে যাঁরা নিয়মিত যোগাভ্যাস করেন, তাঁদের পক্ষে যে কোনও স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ় করাটাও সহজ হয়৷’’ তবে স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ় শুরু করার আগে মাসলের নাম, কোনটির ক্ষেত্রে কোন ব্যায়াম কাজে দেয় এ জাতীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করে নিতে পারেন, তা হলে পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে মাসলে স্ট্রেচ পড়ার কথা, ঠিক সেখানেই সেটা পড়ছে কিনা৷ তাতে দিনের পর দিন ভুল ব্যায়াম করতে হবে না৷ তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রথম দিন থেকেই ভিডিয়ো বা ইন্টারনেট দেখে অ্যাডভান্স লেভেলের স্ট্রেচিং অভ্যেস করতে আরম্ভ করবেন না৷ ট্রেনারের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে ইন্টেনসিটি বাড়ানোর ব্যাপারে জোর দিন৷

ফ্লেক্সিবল থাকতে স্ট্রেচিং অভ্যাস করুনঃ
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পেশির স্থিতিস্থাপকতা ক্রমশ কমতে থাকে, জোড়গুলি কঠিন হয়ে আসে৷ তার প্রভাব পড়ে আমাদের চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজকর্মে৷ এই পরিস্থিতি এড়াতে চাইলে স্ট্রেচিং অভ্যেস করতে আরম্ভ করুন আজই৷ যত ফ্লেক্সিবল থাকবেন, তত নির্বিঘ্নে চলবে দৈনন্দিন কাজকর্ম৷ প্রথমদিকে হয়তো স্ট্রেচ করতে অসুবিধে হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরেরও সয়ে যাবে বাড়তি পরিশ্রমটা৷ স্ট্রেচিংয়ের ফলে মাসলের ফ্যাটিগ কমে, প্রতিটি অঙ্গে বাড়ে অক্সিজেনের জোগান৷ এর ফলে লক্ষ্যণীয়ভাবে বাড়তে আরম্ভ করে আপনার স্ট্যামিনা৷ ব্যায়ামের পূর্ণ সুবিধে উপভোগ করতে চাইলে স্ট্রেচিং বাদ দেওয়ার কোনও উপায় নেই কিন্তু!

স্ট্রেচিংয়ের আগে প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিনঃ
বলা হয়, যাঁদের রক্তে গ্লুকোজ়ের মাত্রা বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে স্ট্রেচিং খুব কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে৷ ‘জার্নাল অফ ফিজ়িওথেরাপি’তে 2011 সালে প্রকাশিত একটি স্টাডিতে বলা হয়েছে যে প্রতিদিন যদি আমরা অন্তত 20 মিনিট প্যাসিভ স্ট্রেচিং অভ্যেস করি, তা হলে কমতে আরম্ভ করবে রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ়ের মাত্রা৷ টাইপ 2 ডায়াবেটিসে ভুগছেন এমন কিছু রোগীর উপর সমীক্ষা চালিয়ে তবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷ তা ছাড়া বাড়ে ব্যালান্স বজায় রাখার ক্ষমতাও৷ যাঁরা স্পন্ডিলোসিসের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা যদি প্রতিদিন ঘাড় আর গলার স্ট্রেচিং করে যান সারা জীবন এবং ডাক্তার নির্দেশিত নিয়মগুলি মেনে চলেন, তা হলে নিশ্চিতভাবেই আরাম পাবেন৷ বসে বা দাঁড়িয়ে এই ব্যায়াম অভ্যেস করতে পারেন৷ প্রথমে মাথা সোজা রেখে দাঁড়ান বা বসুন৷ তারপর মাথাটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনুন বুকের উপর, চিবুকটা যতদূর নামানো সম্ভব নামান৷ মাথা নিয়ে যান ডানদিকে, রোল করে পিছন থেকে বাঁদিকে নিয়ে আসুন৷ এবার বাঁদিক থেকে একইভাবে নিয়ে যান ডানদিকে৷ এতে একটা সেট পুরো হল৷ এইভাবে 10টি করে তিনসেট অভ্যেস করুন৷

পায়ের জন্য স্ট্রেচিং জরুরিঃ
পায়ের জন্যও খুব ভালো ভালো কিছু স্ট্রেচিং আছে৷ হ্যামস্ট্রিংয়ের স্ট্রেচিং শুয়ে বা দাঁড়িয়ে করতে পারেন৷ যাঁরা শুয়ে করছেন, তাঁরা পবনমুক্তাসন অভেস করুন৷ পিঠ সোজা করে শুয়ে পড়ুন মাটিতে৷ একটা পা হাঁটু থেকে ভাঁজ করে তুলে নিয়ে আসুন বুকের কাছে৷ হাত দিয়ে চেপে ধরুন৷ এর পর মনে মনে তিরিশ পর্যন্ত গুনে ফের মাটিতে নিয়ে যান, অন্য পায়ে করুন৷ যাঁরা দাঁড়িয়ে করছেন, তাঁরা একই ভঙ্গিমায় হাঁটু ভাঁজ করে বুকের উপর পর্যন্ত তুলে আনুন৷ হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখুন 30 পর্যন্ত, অন্য পায়ে করুন৷ দাঁড়িয়ে করলে আপনার ব্যালান্স উন্নত হবে৷

হাত, কাঁধের জন্য গোমুখাসন আদর্শঃ
কাঁধ, পিঠ আর হাতের স্ট্রেচিংয়ের জন্য আদর্শ হচ্ছে গোমুখাসন৷ পিঠ সোজা করে বসুন আপনার যোগা ম্যাটের উপর, পা থাকবে সামনের দিকে ছড়ানো৷ ডান পা বাঁ পায়ের উপর দিয়ে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে সোজা করে রাখুন৷ বাঁ পা ভাঁজ করে নিন৷ বাঁ হাত পিঠের দিক থেকে পিছনে নিয়ে যান, ডান হাত পিছনে নিয়ে যান কাঁধের দিক থেকে, দুই হাতের পাতা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরবে৷ পিঠ টান টান করে রাখুন৷ এইভাবে 30 পর্যন্ত গুনতে হবে৷ তার পর পা সোজা করুন, হাত নামিয়ে নিন৷ আগের বার যদি ডান পা উপরে থাকে, তা হলে এবার বাঁ পা উপরে রেখে একই ভঙ্গিমায় বসুন, এবার ডান হাত পিছনে নিয়ে যান পিঠের দিক থেকে, বাঁ হাত কাঁধের দিক থেকে৷ আগের মতোই পাতা দুটো পরস্পরকে আঁকড়ে ধরবে৷ তিরিশ সেকেন্ড রাখুন৷

পায়ের মাসলের জন্য লাঞ্জেস আদর্শঃ
পায়ের মাসলকে শক্তপোক্ত করে তোলার জন্য লাঞ্জেস আদর্শ ব্যায়াম৷ তবে কোনও প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে প্রথমবার শুরু করা ভালো, কারণ তা হলে আপনার পশ্চার একেবারে পারফেক্ট হবে৷ লাঞ্জের ক্ষেত্রে একটা পা হাঁটু থেকে সমকোণে ভাঙবে, অন্য পা পিছন দিকে যতটা পারেন স্ট্রেচ করুন৷ একইভাবে সাইড লাঞ্জেসও করা যায়, সেক্ষেত্রে ভাঁজ করা ও স্ট্রেচ করা পায়ের অবস্থান হবে পরস্পরের কোনাকুনি৷ শুরুর দিকে এক এক বারে 10টা করে লাঞ্জেস করুন, পরে এটা বাড়িয়ে 30-এ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে৷ পুরো স্ট্রেচটা পড়বে আপনার হ্যামস্ট্রিংয়ে৷

কোয়াড্রিসেপসের স্ট্রেচিংও করা উচিতঃ
কোয়াড্রিসেপসের স্ট্রেচ করার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়ান৷ ডান পায়ে ভর দিয়ে বাঁ পা ভাঁজ করে নিতম্ব পর্যন্ত নিয়ে যান৷ হাঁটু দুটো থাকবে সরলরেখায় ও খুব কাছাকাছি, নিতম্বটা সামনের দিকে নিয়ে যান, তাতে স্ট্রেচটা বেশি করে পড়বে৷ এইভাবে 30 গুনুন৷ তার পর অন্য পায়ে রিপিট করবেন৷

সাইড স্কোয়াটঃ
শরীরের নিম্নভাগের টোনিংয়ের জন্য অপরিহার্য ব্যায়াম হচ্ছে সাইড স্কোয়াটস৷ পা, গ্লুটস, থাইয়ের পেশিগুলির উপর কাজ করে এই ব্যায়াম৷ সোজা হয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়ান৷ তার পর হাত সামনে রেখে একদিকের পায়ের উপর ভর দিয়ে মাটির যতটা কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব, ততটা গিয়ে হিপ নামানোর চেষ্টা করুন৷ অন্যদিকের পা পুরো স্ট্রেচ হবে৷ ফের আগের ভঙ্গিমায় ফিরে যান, অন্য পায়ে করুন৷ প্রথমদিকে 10 দিয়ে শুরু করুন, তার পর 30 পর্যন্ত যেতে পারলে খুব ভালো হয়৷

হাত, পা ও পিঠের স্ট্রেচিংঃ
পিঠ, হাত আর পায়ের পেশিগুলিকে টানটান রাখতে চান? তা হলে পিঠ টান করে বসুন৷ তার পর পা ছড়িয়ে দিন সামনের দিকে৷ যতদূর সম্ভব স্ট্রেচ করুন পা দু’টিকে৷ এবার ডান পা ভাঁজ করে নিয়ে আসুন বাঁ পায়ের দিকে৷ পায়ের পাতা যেন থাইয়ের উপরের দিকের ভিতরের অংশের সঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকে৷ এবার দুটো হাত দিয়ে স্ট্রেচ করে রাখা পায়ের পাতা স্পর্শ করার চেষ্টা করুন৷ শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়েও দেওয়া যায়৷ এই ব্যায়ামটিই যদি দাঁড়িয়ে করেন, তা হলে আপনার কোমরের কাছেও একটা টান অনুভব করবেন৷ সর্বাঙ্গাসনে খুব ভালো স্ট্রেচিং হয়৷ কোমর থেকে পুরো শরীরটা সোজা নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে উপরে তুলুন৷ কোমরটা হাত দিয়ে ধরে রাখতে হবে, পা থাকবে উপরে৷ হলাসনের ক্ষেত্রে পা আপনার মাথার উপর দিয়ে পিছনে যাবে৷

এগুলি ছাড়াও যেদিন জিমে গিয়ে যে পেশিগুলির ব্যায়াম করছেন বা ওয়েট/ স্ট্রেংথ ট্রেনিং করছেন, সেদিন সেই মাসলের স্ট্রেচিং করতে ভুলবেন না৷ স্ট্রেচিং ঠিকঠাক হলে আপনার মাসল ক্র্যাম্প ধরার আশঙ্কা কমে, হুট করে চোটও লাগবে না৷ সপ্তাহে অন্তত একটা দিন পুরো সেশনটাই যোগব্যায়ামের জন্য বরাদ্দ করে রাখলেও খুব ভালো ফল পাবে৷

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য