৪৭ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি রাজাকারের গুলিতে নিহত অমুল্য কর্মকারআরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজ পরিবার ও পাড়া প্রতিবেশীদের জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে রামদা নিয়ে সশস্ত্র রাজাকারদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে নিজের জীবন উৎসর্গকারী মহিমাগঞ্জের এক মুক্তিকামী যুবকের ৪৭ বছরেও মেলেনি শহীদের স্বীকৃতি। তিন বছর আগে দৈনিক করতোয়ায় প্রথম এ সংবাদ প্রকাশ হলে মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর শহীদ অমুল্য কর্মকারের বাড়ির সামনের রাস্তাটির নামকরণ তাঁর নামে করলেও আজো মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এলাকার সর্বজন বিদিত এ ঘটনাটি এখনো সবার মুখে মুখে ঘুরলেও শহীদ অমুল্য কর্মকারের স্বজনরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও শহীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করতে পারেননি তার নাম। বর্তমানে ‘শহীদ অমুল্য কর্মকার সড়ক’ নামে রাস্তার নাম ফলকটিও ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছে।

শহীদের স্বজন ও এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর, শনিবার। পরাধীনতার ঘোর অমানিশার অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতার সোনালী সূর্য্য উঁকি দিচ্ছে বাংলার পূর্বাকাশে। সোনারবাংলার দামাল ছেলেরা দুর্বার গতিতে মাতৃভুমির প্রতি ইঞ্চি জমি শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করছে প্রতিদিন। একের পর এক শহর-গ্রাম-জনপদে উড়তে শুরু করেছে লাল-সবুজের মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। তৎকালীন রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকুমা সদরসহ বেশ কিছু এলাকা শত্রুমুক্ত হয়েছে ইতিমধ্যে। উত্তাল ৭১’র একেবারে শেষের এ লগ্নে দেশের সর্ববৃহৎ চিনিকল, বিখ্যাত কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা কারণে গড়ে ওঠা বিশাল ও সুপরিচিত জনপদ রংপুর জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার মহিমাগঞ্জের দুটি ক্যাম্প থেকে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী।

নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় বিভিন্ন গ্রামে পালিয়ে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন নতুন আশায়। এ সময় চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র চারদিন আর এই এলাকার বিজয়ের মাত্র ২৪ ঘন্টা পূর্বে ১১ ডিসেম্বর ঘৃণিত রাজাকাদের হাত থেকে নিজের স্ত্রীসহ পাড়ার নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন মহিমাগঞ্জের এক অকুতোভয় যুবক অমূল্য কর্মকার। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি পাড়ার বাড়িঘর ও ধন-সম্পদ আর নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় একক প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাজাকারের গুলিতে নিহত হলেন তিনি। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী অদম্য সাহসী অমূল্য কর্মকার ৪৫ বছরেও পাননি শহীদের মর্যাদা। সকলের চোখের আড়ালে নিরবে-নিভৃতেই কেটে যাচ্ছে তাঁর মৃত্যুদিবসটি। একটি পাড়ার অনেকগুলো বাড়ির ধনসম্পদ আর নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় তাঁর সেদিনের বীরত্বের কথা জানেনা নতুন প্রজন্মও।

মহিমাগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা ও রংপুর চিনিকলের অতিথিভবনে স্থাপিত পাকসেনাদের ক্যাম্পে প্রায় প্রতিরাতেই নারীদের সম্ভ্রমহানি আর হত্যার ঘটনা চলে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে। মহিমাগঞ্জ বাজারের বেশ ক’টি বাড়ি এবং জিরাই জেলেপাড়া থেকে অনেক ক’জন নারীকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে আটকে রেখে সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে (তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চান না)। এ কারণে উচ্চবিত্ত হিন্দু পরিবারগুলোর অধিকাংশই পালিয়ে গেছে ভারতে। দরিদ্র পরিবারগুলো পালিয়ে আছে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে।

মহিমাগঞ্জের প্রায় সকল বাসা-বাড়ি লুটপাটের পর দখল করে নিয়েছে স্থানীয় দালালরা। মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে ১১ ডিসেম্বর’৭১, শনিবার। বিভিন্ন গ্রামে পালিয়ে থাকা স্থানীয় কর্মকারপাড়ার বাড়িতে ফেরা দরিদ্র মানুষদের শেষ সম্বলটুকু এবং নারীদের সম্ভ্রম লুট করতে শেষ অপারেশন হিসেবে বেছে নেয় রাজাকাররা ওইদিন। মহিমাগঞ্জের হাটবার ছিলো সেদিন। বিকেল চার-সাড়ে চারটা। চরম ভীতিকর অবস্থাতেও প্রয়োজনের তাগিদে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা হাটে গেছেন অনেকেই। এ সুযোগে কর্মকারপাড়ায় ঢুকে পড়ে কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার খোরশেদ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে।

এ সময় জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে নারী-শিশুরা বাড়ির পিছন দিয়ে পালিয়ে গেলেও রাজাকারদের প্রতিরোধ করতে একাই দাঁড়িয়ে যান ওই পাড়ার মৃত প্রসন্ন কর্মকারের জ্যেষ্ঠ পুত্র অকুতোভয় যুবক অমূল্য কর্মকার। আত্মরক্ষার জন্য তাঁর সে সময়ের গোপনসঙ্গী একটি বিশাল রামদা উঁচিয়ে তিনি ঘরের দরজার আড়ালে প্রস্তুত হয়ে যান শত্রুনিধনে। কিন্তু চাটাইয়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তা দেখে ফেলে আরেক রাজাকার মালেক। কমান্ডার খোরশেদকে রক্ষা করতে জানালা দিয়ে সাথে সাথে খুব কাছ থেকে গুলি চালায় সে অমূল্য কর্মকারের পেটে। এরপর আর লুটপাট না করতে পেরে সেখান থেকে চলে যায় তারা।

বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে থাকা স্বজনরা গুলির শব্দ শুনে ছুটে এলেও কোন চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না তখনকার বাস্তবতায়। পার্শ্ববর্তী সরকারী চিকিৎসালয়ের কম্পাউন্ডার আলতাফ হোসেন কেবলমাত্র আয়োডিন আর পুরনো কাপড়ের ব্যান্ডেজ দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করে তাঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। রক্তের বন্যায় ভেসে ধুঁকতে ধুঁকতে রাত ন’টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অকুতোভয় অমূল্য কর্মকার। পরদিন ১২ ডিসেম্বর রোববার সকালে অতি গোপনে কর্মকারপাড়ার একটি বাঁশঝাড়ের নিচে তাঁকে কবর দেন স্বজনরা। এর কয়েক ঘন্টা পরেই মহিমাগঞ্জে ঢুকে পড়ে মুক্তিসেনা আর মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত বহর মুক্তির পতাকা নিয়ে। জয়বাংলা শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় এখানকার আকাশ-বাতাস। মুক্ত হয় অবরুদ্ধ এ জনপদ। পালিয়ে যায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর এ দেশীয় দালাল-রাজাকাররা।

এরপর দিন গেছে, রাত গেছে। পরিবর্তন হয়েছে দেশের, দেশের মানুষের। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি অমূল্য কর্মকারের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের ভাগ্যের। বিগত ৪৭ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি তাঁর আত্মোৎসর্গের। মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে শহীদ এই দরিদ্র যুবক অমূল্য কর্মকারের পরিবার আজো দেখেনি সুখের মুখ। শহীদের অসহায় বিধবা পতœী সত্তুর বছর বয়সী তরুবালা কর্মকার পাঁচ শিশু সন্তানের সর্বকনিষ্ট কন্যাকে হারান ৭৪’এর দুর্ভিক্ষে।

শহীদের দুই পুত্র রণজিৎ ও সুরজিৎ কর্মকার শিশুকাল থেকেই একজন কর্মকার এবং একজন দর্জি শ্রমিকের কাজ করে চালাচ্ছেন সংসার। এভাবেই বিয়ে দিয়েছেন ছোট দুই বোনের। এখন দুবেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থান করতে পারলেও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন করতে পারেননি তারা। পরের জায়গায় কামারশালা ও পরের দর্জি দোকানের কর্মচারী হয়েই মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। অমূল্য কর্মকারের অসহায় বিধবা পতœী বৃদ্ধা তরুবালা কর্মকার আর দুই পুত্রসহ স্বজনরা রাষ্ট্র ও জাতির কাছে শহীদের প্রাপ্য সম্মানটুকুই কেবল আশা করে দিনাতিপাত করছেন এখন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য