12 15 18

শনিবার, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ৭ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

Home - রংপুর বিভাগ - গুরুত্বপূর্ণ কুড়িগ্রাম-২ আসনে কার ভাগ্যে ছিঁড়ছে শিকে

গুরুত্বপূর্ণ কুড়িগ্রাম-২ আসনে কার ভাগ্যে ছিঁড়ছে শিকে

কুড়িগ্রাম-২ আসনে মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে চলছে চুলছেঁড়া হিসাব। আওয়ামীলীগের বিশাল সংখ্যক নেতা-কর্মীরা অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে কেন্দ্রের দিকে।

App DinajpurNews Gif

এখানে বারবার জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে আসন ছেড়ে দিয়ে আফসোস করতে হয়েছে আওয়ামীলীগকে। মাঠ গুছিয়ে নেওয়ার পরও কেন্দ্র থেকে জাতীয় পার্টির একমাত্র প্রার্থী মরহুম তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সুযোগ করে দেয়া হলেও ভোটে জিতে এলাকা ছাড়া ছিলেন তিনি। কালেভদ্রে এলাকায় আসতেন। একটানা সাইত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জেলার হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যন্নোয়নে চোখে পড়ার মতো কোন কাজ না করায় এলাকার মানুষ তার উপর ছিল নাখোশ।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও নিজ দলকেও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেননি তিনি। জেলায় দুটি কমিটির অস্থিত্ব থাকলেও সেখানে জায়গা হয়নি অভিজ্ঞদের। চলতি বছর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টিতে দেখা দেয় বিশাল শূন্যতা।

এরকম পরিস্থিতিতে দলকে গুছিয়ে নিতে মেজর (অব:) আব্দুস সালাম উদ্যোগ নিলেও হঠাৎ পাল্টে যায় দৃশ্যপট। জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি পনির উদ্দিন আহমেদ পুরনো দল জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েই হাতিয়ে নেন জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব পদটিও। ফলে নির্বাচনে শক্ত ক্যান্ডিডেট হিসেবে আবারো আলোচনায় এসেছেন তিনি।

এর আগে আওয়ামীলীগের সমর্থনে সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার পর যার হাত ধরে তিনি আওয়ামীলীগে এসেছিলেন সেই জাফর আলীর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে তার বিপক্ষে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। উচ্চাভিলাসী এই ব্যবসায়ী নেতা তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর জেলা জাতীয় পার্টির হাল ধরতে আওয়ামীলীগ ছেড়ে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। মূলত: জেলায় লাঙ্গলের জোয়ারের কারণে তার এই দল বদলের সিদ্ধান্ত। লাঙ্গলের প্রতীক নিয়ে বৈতরণী পার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এছাড়াও তাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই চৌধুরী সফিকুল ইসলামও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। ফলে জাতীয় পার্টির টিকিট কে পাচ্ছেন তা নিয়ে চলছে নানান হিসেব নিকেশ। তবে দলীয় চেয়ারপারসন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পূত্র শাদ এরশাদ এই আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করায় পরিস্থিতি জটিল রুপ ধারণ করেছে।

অপরদিকে এই অঞ্চলে বারবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসতে পেরে সাফল্য দেখিয়েছে আওয়ামীলীগ নেতারা। তার আগমনের ফলে পিছিয়ে পরা এ এলাকার মানুষের উন্নয়নে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি। তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে মঙ্গা নামের কলংকের তিলককে। কিন্তু নির্বাচনের সময় বৃহত্তর স্বার্থে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে বারবার মনোনয়ন দেয়ায় দুর্ভাগ্য বয়ে এনেছে আওয়ামীলীগ নেতাদের ভাগ্যে।

এবার আওয়ামীলীগ এই আসনে নিজেদের সু-সংগঠিত দাবি করলেও দল থেকে একাধিক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করায় দলে শুরু হয়েছে টানাপোড়ন। ইতিমধ্যে টিকেট পেতে ব্যক্তি পর্যায়ে শুরু হয়েছে দেীড়ঝাঁপ। বেশির ভাগ নেতা পরে আছেন ঢাকায়। সদর উপজেলা, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে নৌকার কান্ডারী হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মো: জাফর আলী। জেলায় আওয়ামীলীগকে একটি শক্তিশালী একক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পিছনে রয়েছে তার ব্যাপক অবদান।

এর বাইরে বেশ কয়েক জন নেতা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে আলাদাভাবে ভোটের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় এবার ১০জন দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব:) আমসাআ আমিন।

একসময় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সভাপতির পদ প্রত্যাহার করে ঢাকায় নির্বাসনে যাওয়া এই নেতার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করাটা সবার জন্য একটা চমক। তিনি একমাত্র নেতা যিনি আওয়ামীলীগের বাইরে সকল পক্ষকে নিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন দল গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার চলে যাওয়ায় ভেস্তে যায় সেই চেষ্টা। দলে অবাঞ্চিত হয়ে যান অনেক নেতাকর্মী। এরপর ফুলবাড়ীর সন্তান ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা: হামিদুল হক খন্দকার অবসর জীবনে এসে হঠাৎ মনোনয়ন দৌঁড়ে নাম লেখান।

জেলার সাধারণ মানুষ তাকে না চিনলেও তার প্রভাব প্রতিপত্তি তাকে প্রথম সারিতে নিয়ে আসে। বর্তমানে তিনি টিকেট পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেদিক থেকে ছাত্র জীবনে বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক, সাবেক রাকসু এজিএস ও সিনেট সদস্য, জেলা আইনজীবী সমিতির টানা চার বারের সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট অধ্যক্ষ এস.এম আব্রাহাম লিংকন মুখিয়ে আছেন দলীয় টিকেট পাওয়ার জন্য।

দলের ভিতরে তার অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হলেও দলের বাইরে রয়েছে তার ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা। সংসদে আইন প্রণেতা হিসেবে তিনি ভাল করবেন বলে সচেতন ভোটাররা মনে করেন। এছাড়াও দলীয় মনোনয়ন পেতে উঠে পরে লেগেছেন জেলা যুবলীগের আহবায়ক অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন দুলাল। নেতৃত্বের প্রশ্নে মূল দলের সাথে তার কিছুটা দুরত্ব থাকলেও যুব ভোটারদের নিয়ে লড়াই করতে চান তিনি।

এর বাইরেও মনোননয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু, জেলা পরিষদ সদস্য মাহবুবা আক্তার লাভলী, শাহানা পারভীন ও জেলা আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, চলচিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আবু সুফিয়ান।

আওয়ামীলীগে যখন একাধিক প্রার্থী তখন বিএনপি কিছুটা নির্ভার। কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে এই অঞ্চলের সন্তান রুহুল কবীর রিজভীর নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়নপত্র কেনেননি। বতর্মানে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জেলা বিএনপি’র সুখ-দুঃখের কান্ডারী ও বর্তমান উপদেষ্টা উমর ফারুক, সহ-সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আবু বকর সিদ্দিক এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ।

এই আসন থেকে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় পোস্টার বিলবোর্ড লাগিয়ে তিনি সকলের নজর কাড়েন। এছাড়াও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি মাঠ ময়দানে সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ইউনিয়নে ইউনিয়নে রয়েছে তার সমর্থক গোষ্ঠী। ফলে নির্বাচনী লড়াই থেকে তিনি পিছু হটবেন না। তার হাত ধরে চমকের অপেক্ষায় আছে দলটি।

এছাড়াও এই আসনে থেকে মহান স্বাধীনতা যুুদ্ধে কুড়িগ্রামে প্রথম বিজয় পতাকা নিয়ে প্রবেশ করা বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকার এবং জামায়াত নেতা এডভোকেট ইয়াসিন আলী সরকার স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। ইসলামী ঐক্যজোট থেকেও মনোনয়ন সংগ্রহ করা হয়েছে। সিপিবি থেকে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি উপেন্দ্রনাথ রায় এবং জেলা জাসদের সভাপতি ইমদাদুল হক এমদাদ মনোনয়ন সংগ্রহ করছেন বলে জানা গেছে।

এরকম পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রাম-২ আসনে রাতের ঘুম হারাম অবস্থা মহাজোট প্রার্থীদের। শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জোটে কাংখিত মনোনয়নের টিকেট এই নিয়ে প্রার্থীরা ছাড়াও সমর্থক-ভোটাররা উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন।

বর্তমানে এই আসনে সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া বারবার বিরোধী এমপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনে কুড়িগ্রামকে অনেক পিছিয়ে যেতে হয়েছে। এবার সরকারদলীয় এমপি চান সবাই। কিন্তু কে যাচ্ছে ক্ষমতায় সে নিয়েও চলছে চুলছেঁড়া হিসেব। জোট না ঐক্যফ্রন্ট! ফলে এনিয়েও আছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। ফলে সবাই চান এককভাবে নির্বাচনে যাক দলগুলো। যাতে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। বিজয়ী করে আনতে পারেন একজন যোগ্য নেতাকে। কিন্তু জোটবদ্ধ হওয়ায় এবারও গিলতে হতে পারে এমন প্রার্থীকে যাকে সবাই পছন্দ নাও করতে পারেন।

তাই চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে কুড়িগ্রাম-২ আসনের ভোটারসহ প্রার্থী, সমর্থক ও কর্মীরা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য