বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সদস্যরাজনীতিতে নতুন নন শেখ রাহমান। আশির শতকের প্রথম দিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ক্যাম্পেইনে কাজ করার মধ্য দিয়ে দলটিতে নিজের অবস্থানের ব্যাপারে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তিনি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও জর্জিয়ার মতো রাজ্যের সিনেটর হবেন, এমন স্বপ্ন দেখার সাহসও ছিল না তার। তবে আফ্রিকান-আমেরিকান বারাক ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় উৎসাহী হন তিনি। মনে হতে থাকে, ‘কোনও একদিন আমিও নির্বাচিত হতে পারি।’

নিজের নায়ক বারাক ওবামার মতো শেখ রাহমানের স্বপ্নও এবার সত্যি হতে চলেছে। আগামী ৭ নভেম্বর সকালে নির্বাচিত রাজনীতিকের তালিকায় নাম লেখাবেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে জর্জিয়ার প্রাদেশিক সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার গৌরব লাভ করবেন এ রাজনীতিক। একইসঙ্গে এই প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও রাজ্যে নির্বাচিত হওয়ার সম্মান লাভ করবেন তিনি।

শেখ রাহমান বলেন, ‘এটা খুবই চমৎকার। একটি স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। ইতোমধ্যেই জীবন পরিবর্তন হয়ে গেছে। এতে কোনও সন্দেহ নেই।’

গত গ্রীষ্মেই শেখ রাহমান সিনেটের আসনটিতে জয়ের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত হন। ওই সময় দলীয় প্রাইমারিতে নিজের প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেন তিনি। মূলত এই দলীয় প্রাইমারিতেই নিজেদের চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করে থাকে আমেরিকার বড় দুই রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু জর্জিয়ার ওই আসনে রিপাবলিকান পার্টির কোনও প্রার্থী না থাকায় এরইমধ্যে ৬ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

শেখ রাহমান রাজ্য সিনেটে জর্জিয়ার সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি জেলার প্রতিনিধিত্ব করবেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ জেলা। ভিন্ন ভিন্ন রকমের এই মানুষেরাই তার জয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছেন। স্থানীয় জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ। কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ, হিস্পানিক ২১ শতাংশ এবং এশীয় ১১ শতাংশ।

এই রাজনীতিক স্বীকার করেছেন যে, তার রাজ্যে ভোটারদের মধ্যে দুই ধরনের ভোটার রয়েছে। এক ধরনের ভোটার হচ্ছেন গ্রামীণ জনসাধারণ। অন্যরা শহুরে ভোটার এবং তাদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনও কমিউনিটির ভোটের ওপর নির্ভর করে জয় পাননি তিনি। সমর্থন পেয়েছেন মূল ধারার রাজনীতিতে।

শেখ রাহমান বলেন, ‘আমি মূল ধারার। আমার ভোটারদের ৯৭ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক।’

আসনটিতে প্রায় ৩০০ বাংলাদেশি-আমেরিকান রয়েছেন। তবে শেখ রাহমান জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে তিনি অর্ধেকের মতো ভোট পেয়েছেন।

শেখ রাহমানের এই উত্থান মার্কিন মুলুকে একজন ইমিগ্রান্টের সফলতার গল্প। বাংলাদেশের একটি স্বচ্ছল পরিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কলেজে পড়াশোনার ব্যয় বহনের জন্য তিনি একটি রেস্টুরেন্টে ডিশ ওয়াশার হিসেবে কাজ করতেন। এর বাইরেও তিনি কঠিন সব পরিশ্রমের কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন নিয়মিত পড়াশোনা। ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া থেকে বিজনেসের ওপর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

ইরানের জিম্মি সংকটের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, এটি ছিল জেনোফোবিয়ার (বিদেশীদের সম্বন্ধে অহেতুক ভয়) দংশন।

তিনি বলেন, তারা রাগান্বিতভাবে ঘুরে ঘুরে আমার উদ্দেশে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু আমি জানতাম যে, কঠোর পরিশ্রম করলে এই দেশে কিছুই অসম্ভব নয়।

২০১২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় দফায় নির্বাচনি প্রচারণার সময় ওবামার একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।২০১৬ সালে রাজ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

শেখ রাহমান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি আমেরিকানদের আরও বেশি করে যুক্ত হওয়ার এটাই সঠিক সময়।

তিনি বলেন, ‘আমি এমন তরুণ বাংলাদেশি-আমেরিকানদের দেখি যারা ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধনও করেনি। এমনকি তাদের বাবা-মা মনে করেন যে, তাদের সন্তানরা ডাক্তার ও প্রকৌশলী হয়ে উঠেছে এবং তারা ইতোমধ্যেই তাদের আমেরিকান ড্রিম অর্জন করেছে।

মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্পের উত্থানে ভীত এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক। তিনি বলেন, আমরা একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। কিন্তু ট্রাম্পের বিজয় যেন পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি শেখ রাহমানের পরামর্শ, আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়। আমার চেয়ে আপনাদের জন্য আরও ভালো সুযোগ রয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য