লালমনিরহাটে বেগুনের প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকআজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ এ বছর লালমনিরহাটে বেগুনের ফলন হয়েছে দারুণ। বিশেষ করে গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার জেলার বহু সবজিচাষী বেগুন আবাদ করেন। এখন চলছে সবজিটির ভরা মৌসুম। লালমনিরহাটের বিভিন্ন হাটে বেগুনের দেখা মিলছে অজস্র। তবে কৃষকদের অভিযোগ, ভালো ফলনে আশান্বিত হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা।

কৃষকরা জানান, গত বছর বেগুনের দাম ভালো পাওয়ায় এবারও জেলার আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ি , সারপুকুর, ভেলাবাড়ি, দুর্গাপুর এলাকায় বেগুন চাষে প্রায় এলাকা ভরে গেছে। তারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে উৎপাদিত বেগুনের নায্যে দাম পাচ্ছে না তারা। এবছর প্রকৃতিতে বৃষ্টির অভাবে ফলনও হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম।

খরচ উঠলেও লাভবান হওয়ার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছেন না বেগুনচাষীরা। বিগত বছরে বন্যার কারণে অন্যান্য সবজি নষ্ট হওয়ায় সারাদেশে সবজি হিসেবে ব্যাপক কদর ছিল বেগুনের। ফলে লাভে লাল হয়েছিল এ অঞ্চলের বেগুনচাষীরা। কিন্তু এ বছর বন্যা না থাকায় অন্যান্য সবজিতে বাজার এখন ভরপুর তাই চাহিদা কমেছে বেগুনের। ফলে মুনাফাও কম পাচ্ছেন বেগুন চাষীরা।

চাষীরা জানান, বন্যাকালীন মানুষের সবজির চাহিদা পুরণে জুলাই-আগস্ট মাসে আষাঢ়ে বেগুনের চারা রোপণ করেন উঁচু এলাকার সবজি চাষিরা। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বেগুন বাজারে উঠতে শুরু করে। কিন্তু এ বছর বন্যা না হওয়ায় অন্যান্য সবজিতে বাজার ভরপুর তাই বেগুনের চাহিদা অনেকটাই কম। সেজন্য দামও কম।

গত বছর অক্টোবর মাসে প্রতিমণ বেগুন বিক্রি হয়েছিল দেড় হাজার টাকা দামে। এ বছর বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। দিন যতই যাবে অন্যান্য শীতকালীন সবজি এলে আরো কমে যাবে বেগুনের গুণ। ফলে উৎপাদন খরচ নিয়ে দুঃচিন্তায় বেগুনচাষীরা।

লালমনিরহাটে বেগুনের প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকসবজি চাষ খ্যাত আদিতমারী উপজেলার বড় কমলাবাড়ি গ্রামের আব্দুর নুর মাস্টার জানান, এ বছর প্রায় ১ একর জমিতে বেগুন চাষ করে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছে এবং বিক্রি করে আসলতো দুরের কথা কামলা-কৃষান ও ঔষধ দিতে সব চলে যাচ্ছে। গত বছর তিন দোন (২৭ শতাংশে এক দোন) জমিতে বেগুন চাষ করে দেড়/দুই লাখ টাকা আয় করেছিলেন।

এ বছরও ওই জমিতে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে বেগুন চাষ করেছেন। এ বছর বৃষ্টি না থাকায় সেচ খরচ ও কীটনাশক খরচ বেড়ে গেলেও উৎপাদন কম হয়েছে। কমে গেছে বেগুনের বাজার মূল্য।

চারদিন পরপর বেগুন তুলে পাচ্ছেন ১৫/১৬ মণ। যার শ্রমিক ও কীটনাশক খরচ যায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। একবার বেগুন তুললে পরদিন দুই হাজার টাকায় কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। একদিন বেগুন তুলতে শ্রমিক খরচ পড়ছে দেড় হাজার টাকা। সব মিলে উৎপাদন খরচ নিয়ে চিন্তিত চাষী আব্দুর নুর।

ওই গ্রামের ইদ্রীস মিয়া ৫৪ শতাংশ জমি থেকে লক্ষাধিক টাকা আয় করেছেন। তাই এ বছরও ওই জমিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বেগুন চাষ করেছেন। এখনও সপ্তাহে প্রায় দুই দিন স্প্রে করছেন আড়াই হাজার টাকা খরচে। আর প্রতি সপ্তাহে দুই কিস্তিতে বেগুন পাচ্ছেন মাত্র ২০ মণ। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮ হাজার টাকা। খরচ উঠলেও লাভের খাতা শুন্য হওয়ার আশঙ্কা তার। তিনি বলেন, গত বছর দাম ভাল থাকায় মুনাফাও ভালই হয়েছে। এ বছর দামই নেই।

এসব চাষিদের উৎপাদিত বেগুন প্রতিদিন ট্রাক ভরে চলে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ সারা দেশে। এ সময় মৌসুমী সবজি ব্যবসায়ীদেরও আয়ের পথ খুলে যায়। তারা সারাদিন চাষীদের সবজি ক্ষেত থেকে কিনে ট্রাকে ভরে দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারে পাঠায়। বছরে ৯ মাস চলে তাদের সবজি ব্যবসা।

আদিতমারী উপজেলার মৌসুমী সবজি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন, নুর হোসেন ও সাইদুর রহমান জানান, তারা চাষীদের ক্ষেত থেকে সবজি কিনে ট্রাকে ভরে পাঠিয়ে দেন দেশের বিভিন্ন বড় বড় বাজারে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা পরদিন সকালে এসব টাটকা সবজি বিক্রি করে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন।

সবজি চাষকে কেন্দ্র করে এসব অঞ্চলে সারা বছর থাকে কৃষি শ্রমিকের কদর। দৈনিক আড়াই থেকে তিন শত টাকা মজুরিতে শ্রম বিক্রি করেন এ অঞ্চলের শ্রমিকরা। তবে নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তারা পুরুষদের সমান পরিশ্রম করলেও পারিশ্রমিক মিলে অর্ধেকের কিছু বেশি। শ্রমিক সাইদুল, রমিচা ও জলিল জানান, সবজি চাষের ফলে তাদের শ্রম বিক্রিতে কোনো সমস্যা হয় না।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিদু ভুষণ রায় জানান, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে পরবর্তীতে ওই ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেন। তবে কৃষক যাতে আগামীতে সবজি উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখেন, সেজন্য তাদের উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য